আমন মৌসুমে সরকারি বীজে আস্থা হারিয়ে খোলা বীজে ঝুঁকছেন বারহাট্টার কৃষক

ছবি: আগামীর সময়
আসন্ন আমন মৌসুমকে সামনে রেখে নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার কৃষকদের মধ্যে সরকারি প্যাকেটজাত বীজের পরিবর্তে খোলা বীজ কেনার প্রবণতা বেড়েছে। গত মৌসুমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ করা বীজ ব্যবহার করে অনেক কৃষক আশানুরূপ ফলন না পাওয়ার দাবি করেছেন। এর সঙ্গে সরকারি বীজের তুলনামূলক বেশি দামও তাদের এই সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলছে। ফলে এবার স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খোলা বীজ সংগ্রহে বেশি আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
উপজেলার গোপালপুর বাজার ঘুরে দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে বস্তাভর্তি ধানের বীজ নিয়ে বসেছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। সেখানে ব্রি ধান-৩৪, ব্রি ধান-৪৯, ব্রি ধান-৩২, ব্রি ধান-১০৩, তেজপাতাসহ বিভিন্ন জাতের ধানের বীজ বিক্রি হচ্ছে। প্রতি শনিবার ও মঙ্গলবারের হাটে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও আশপাশের এলাকা থেকে কৃষকরা এসে এসব খোলা বীজ কিনছেন।
উপজেলার আদর্শ কৃষক তপন চৌধুরী জানান, তিনি এবারও প্রায় ৫০ মণ ধানের বীজ সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর উৎপাদিত বীজের মান ভালো হওয়ায় বিভিন্ন এলাকা থেকে কৃষকরা এসে তা সংগ্রহ করছেন। তিনি বলেছেন, অতীতেও তার উৎপাদিত বীজ সরকারি সংস্থার মাধ্যমে প্যাকেটজাত করে বাজারজাত করা হয়েছে।
আসমা গ্রামের কৃষক লোকমান মিয়া বলেছেন, ‘এখানে যারা বীজ বিক্রি করেন, তারা নিজেরাই অভিজ্ঞ কৃষক। তাদের কাছ থেকে বীজ কিনে আগে কখনো সমস্যায় পড়িনি। তাই এবারও খোলা বীজ কিনতে এসেছি।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বারহাট্টা বাজারে কয়েকজন ব্যবসায়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ক্ষুদ্র কৃষকদের কাছ থেকে মানসম্মত বীজ সংগ্রহ করে নিয়মিত বিক্রি করেন। তাদের মধ্যে চাকুয়া গ্রামের তাবিল মিয়া, গুমুরিয়া গ্রামের হাসেম মিয়াসহ আরও কয়েকজন রয়েছেন। স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, এসব বিক্রেতার কাছ থেকে কেনা বীজের অঙ্কুরোদ্গম ও ফলন ভালো হওয়ায় তাদের প্রতি কৃষকদের আস্থা তৈরি হয়েছে।
তবে কৃষকদের অভিযোগ, গত মৌসুমে সরকারি ব্যবস্থাপনায় সরবরাহ করা বীজ ব্যবহার করে অনেকেই প্রত্যাশিত ফলন পাননি। একই সঙ্গে এসব বীজের দামও খোলা বাজারের তুলনায় বেশি ছিল। ফলে এবার তারা সরকারি প্যাকেটজাত বীজের পরিবর্তে স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত খোলা বীজকেই বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করছেন।
এদিকে স্থানীয়দের অভিযোগ, গত বছর বারহাট্টায় অতিরিক্ত দামে বীজ বিক্রির বিষয়টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বাজার তদারকিতে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধেও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নজির দেখা যায়নি।
শুধু বীজ নয়, কৃষি প্রণোদনা নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রস্তুত করা ২ হাজার ২৪৯ জনের প্রণোদনার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম বাদ দিয়ে অযোগ্য ব্যক্তিদের তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ নিয়ে একাধিকবার অভিযোগ, স্মারকলিপি ও মানববন্ধন হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো সমাধান মেলেনি বলে অভিযোগ তাদের।
এ বিষয়ে বারহাট্টা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শারমিন সুলতানা বলেছেন, ‘বারহাট্টার আদর্শ কৃষকদের কাছ থেকে বীজ কিনলে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বাজার তদারকির জন্য আমাদের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মাঠে কাজ করছেন। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
তবে কৃষকদের দাবি, শুধু অভিযোগের অপেক্ষায় না থেকে নিয়মিত বাজার তদারকি জোরদার, মানসম্মত বীজের সরবরাহ নিশ্চিত এবং কৃষি প্রণোদনা বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তাদের মতে, কৃষকের আস্থা ফিরিয়ে আনতে প্রশাসনের দৃশ্যমান পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে জরুরি।




