খুলনায় ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের’ সাবেক কর্মকর্তা গ্রেপ্তার

গ্রেপ্তার কুব্বাত আলী
খুলনায় মো. মাসুদ শেখ নামে এক ব্যক্তির গলায় গুলিবিদ্ধের ঘটনায় তদন্তে নেমে চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তাদের কাছ থেকে তিনটি বিদেশি পিস্তল, বিভিন্ন মডেলের ছয়টি ম্যাগজিন, আটটি তাজা গুলি, একটি ইলেকট্রিক শক স্টেনগান, দুটি চাইনিজ কুড়াল, একটি চাপাতি, একটি রামদা ও একটি পিতলের রড উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে’ চাকরিকালীন একটি পরিচয়পত্রও জব্দ করা হয়েছে।
গত বুধবার নগরীর টুটপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকার দারোগাপাড়া মহিউদ্দিন লেনের একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তাররা হলেন খান কুব্বাত আলী, তার স্ত্রী মোছা. শামসুন্নাহার, ছেলে কেএম আবির হাসান ও রফিকুল ইসলাম টুকু।
পুলিশ জানায়, বুধবার বেলা সোয়া ১১টার দিকে নগরীর টুটপাড়া পুলিশ ফাঁড়ি এলাকায় দুর্বৃত্তরা মো. মাসুদ শেখ (৪৫) নামে একজনকে গুলি করে। মাসুদের গলায় গুলি লাগে। তিনি তেরখাদা উপজেলার দুলু শেখের ছেলে। গুলিবিদ্ধ হওয়ার পরপরই ঘটনার তদন্তে নামে খুলনা সদর থানা পুলিশ। গুলি সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে টুটপাড়া এলাকায় তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সাঁড়াশি অভিযান শুরু করা হয়।
একপর্যায়ে সন্ধ্যার আগে পুলিশ জানতে পারে, টুটপাড়া এলাকার দারোগাপাড়া মহিউদ্দিন লেনের কেএম ইমতিয়াজ আলীর বাড়ির দোতলার একটি ফ্ল্যাটে গুলির ঘটনায় জড়িতরা অবস্থান করছেন। পরে ওই তথ্যের ভিত্তিতে বাড়িটিতে অভিযান চালায় পুলিশ। অভিযানের সময় ফ্ল্যাটের ডাইনিং রুমের একটি চেয়ারের ওপর থেকে প্রথমে একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়। পরে ঘরের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালিয়ে আরও দুটি বিদেশি পিস্তল, ছয়টি ম্যাগজিন ও আটটি গুলি উদ্ধার করা হয়।
পুলিশের দাবি, সন্ধ্যার দিকে ওই ফ্ল্যাটে আরও তল্লাশি চালিয়ে একটি ইলেকট্রিক শক স্টেনগান, দুটি চাইনিজ কুড়াল, একটি চাপাতি, একটি রামদা, একটি পিতলের রডসহ দেশীয় তৈরি আরও কয়েকটি অস্ত্র এবং আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একটি পরিচয়পত্র উদ্ধার করা হয়। এ সময় গুলির ঘটনায় সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে খান কুব্বাত আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তার স্ত্রী শামসুন্নাহার, ছেলে কেএম আবির হাসান ও রফিকুল ইসলাম টুকুকেও গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার চারজনের মধ্যে খান কুব্বাত আলী, শামসুন্নাহার ও আবির হাসান ওই বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। তাদের গ্রামের বাড়ি তেরখাদার নাচুনিয়া গ্রামে। খান কুব্বাত আলী ওই গ্রামের মৃত আব্দুর রশিদ খানের ছেলে।
পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে খান কুব্বাত আলী বলেন, ‘তিনি রাজশাহী রেলওয়েতে অডিট অফিসার হিসেবে চাকরি করেছেন। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ে অডিট অফিসার এবং ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে ডেপুটি চিফ অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফাইন্যান্স অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সর্বশেষ খুলনার ডেপুটি ডিভিশনাল কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে অবসরে যান।’
এদিকে খান কুব্বাত আলীর এলাকার লোকজনের সূত্রে জানা যায়, তিনি একসময় রেলওয়েতে চাকরি করতেন। এলাকায় নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। পারিবারিকভাবে তার পরিবার আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। তবে এলাকাবাসীর কাছে তিনি প্রতারক হিসেবে পরিচিত বলে স্থানীয় সূত্র দাবি করেছে।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গ্রেপ্তার খান কুব্বাত আলী ২০১৯ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তিন বছর অডিট অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে চাকরিকালীন তার পরিচয়পত্রও জব্দ করা হয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারের পর তাদের থানায় নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।’
ওসি বলেন, ‘গ্রেপ্তার খান কুব্বাত আলী সমাজে ভদ্রবেশী মুখোশের আড়ালে সন্ত্রাসী।’ তার ধারণা, জমি সংক্রান্ত বিরোধে গুলির ঘটনা ঘটতে পারে।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৪টা পর্যন্ত গ্রেপ্তার চারজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়নি। তবে এ ঘটনায় মামলা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি।








