‘মানিক’ এখন হাজারো এতিমের ঈদের আনন্দ

ছবি: আগামীর সময়
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ভেঙ্গুলার গ্রামের আব্দুল হামিদের মেয়ে হামিদা আক্তার (২৯)। ২৪ সালে অনার্স পড়ার সময় মাকে হারিয়েছেন তিনি। ঘরে বৃদ্ধ বাবা আর ছোট বোন। মাস্টার্সে পড়ার পাশাপাশি একটি বিকাশের দোকান চালান আর দেখভাল করেন নিজের ছোট খামারটি। এই খামারেই গত ১০ বছর ধরে লালন-পালন করেছিলেন সাদা-কলো রঙের এক বিশালদেহী ষাঁড়কে। যার নাম রেখেছিলেন ‘মানিক’। প্রায় ৫৬ মণ ওজনের মানিকের প্রতিদিনের খাবার ছিল ১০ হালি বিচি কলা, ৪ কেজি বুট, ভুসি আর আতপ চালের ভাত।
হামিদা আশা করেছিলেন গত কোরবানির ঈদেই ভালো দামে বিক্রি হবে মানিক। ১৫ লাখ টাকায় মানিককে কিনবেন কথা দিয়েও আর ফিরে আসেননি এক ক্রেতা। নিরুপায় হামিদা ধারদেনা করে আরও এক বছর টানলেন মানিকের রাজকীয় খরচের বোঝা। এবারের ঈদেও ১৮ লাখ টাকায় কিনবেন বলে উধাও হয়ে যান এক ক্রেতা।
এদিকে বিশালাকৃতির মানিকের ভিডিও বানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাখ লাখ লাইক আর ভিউ পেয়েছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটররা। আয় করেছেন। কিন্তু ক্যামেরার পেছনের অসহায় হামিদার কান্না, তার পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়ার গল্পটা বোঝার বা তার পাশে দাঁড়ানোর ন্যূনতম মানবিকতা দেখাননি কেউ। হামিদার অসহায়ত্ব কেবলই পরিণত হয়েছিল ইন্টারনেটের বিনোদনে।
হামিদা আক্তার বললেন, ‘১০ বছর ধরে গরু পালন করছি। খরচের অর্ধেক টাকাও ওঠে নাই। কষ্ট, পরিশ্রম, রাতজাগা সব বাদই দিলাম। প্রতিদিনের এত খরচ সামলাতে গিয়ে অনেক টাকা ধারদেনা হয়ে গেছে।’
অনলাইনে হামিদার এই আকুতি নজরে আসে কুষ্টিয়ার কুমারখালীর সমাজসেবক আলাউদ্দিন আহমেদের। তিনি আর দেরি করেননি। আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে ১১ লাখ ২০ হাজার টাকায় কিনে নেন মানিককে।
যদিও মানিকের পেছনে যে খরচ হয়েছে, সেই তুলনায় এই দাম অনেক কম, তবুও কসাই বা দালালের হাতে মানিককে তুলে দিতে হয়নি, এটাই সবচেয়ে বড় শান্তি হামিদার। এই টাকায় নিজের ঋণের একটা বড় অংশ শোধ করতে পেরেছেন তিনি। তবে এখনো ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা ঋণ রয়ে গেছে তার।
গত সোমবার টাঙ্গাইল থেকে মানিককে নিয়ে আসা হয়েছে আলাউদ্দিনের খামারে। বুধবার সকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের ঘরে দিব্যি রাজকীয় হালে আছে শান্ত স্বভাবের মানিক।
খামারের কর্মচারী রেহেনা বেগম জানান, মানিককে অত্যন্ত উন্নতমানের খাবার দিয়ে যত্ন করা হচ্ছে।
কোরবানি ঈদের তৃতীয় দিন কয়েক হাজার এতিম শিশু ও বৃদ্ধাশ্রমের নিঃসঙ্গ মানুষদের মুখে তুলে দেওয়া হবে মানিকের মাংস।
মানিককে হারিয়ে চোখের কোণে জল থাকলেও হামিদা এখন স্বপ্ন দেখছেন নতুন করে বেঁচে থাকার। খামারে এখনো ১০টি গরু আছে তার।
হামিদার ভাষ্য, ‘একজন ভালো লোকের কাছে মানিককে বিক্রি করতে পেরে আমি খুব খুশি। আমার ইচ্ছা একটা বড় খামার করার, আর লাভের টাকায় অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর।’
আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশনের ব্যবস্থাপক মোর্শেদ আলম জানান, মলিন মুখগুলোতে একটুখানি পরম তৃপ্তির হাসি ফোটাতেই আলাউদ্দিন আহমেদ এই উদ্যোগ নিয়েছেন। আর এই এক মানবিক উদ্যোগের মাধ্যমেই অবসান ঘটলো এক নারীর ১০ বছরের দীর্ঘ নীরব লড়াই কষ্টের।
তিনি বললেন, ‘আলাউদ্দিন আহমেদ ফাউন্ডেশন সবসময় মানুষের কল্যাণে কাজ করে থাকে। আগামীতেও এমন মহৎ উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে।’








