শহর ছাড়ে না বাস দূরে ফাঁকা টার্মিনাল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাজশাহী শহরের ভেতর থেকে দূরপাল্লার বাস সরিয়ে যানজট ও দুর্ঘটনা কমানোর লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্যেই ২০০৪ সালে ৭ দশমিক ৪১ একর জমির ওপর ৭ কোটি ১৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় নওদাপাড়া আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল। এরপর পেরিয়ে গেছে ২২ বছর। টার্মিনালে যাওয়ার জন্য ৪ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক হয়েছে, সেটি আবার ৭০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা ব্যয়ে সংস্কার ও প্রশস্ত করা হয়েছে। হয়েছে একাধিক সভা, নেওয়া হয়েছে বাস স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত। কিন্তু দূরপাল্লার বাসের ঠিকানা বদলায়নি। শহরের শিরোইল, ভদ্রা, রেলগেট, তালাইমারীসহ বিভিন্ন সড়কই এখনো বাসের কাউন্টার ও পার্কিংয়ের জায়গা।
নওদাপাড়া টার্মিনাল নির্মাণের পরিকল্পনাটি ছিল বেশ স্পষ্ট। দীর্ঘপথের বাসগুলো শহরের ভেতরে না ঢুকে বাইপাস সড়ক ব্যবহার করবে। ঢাকাগামীসহ আন্তঃজেলা বাসগুলো টার্মিনাল থেকে যাত্রী নিয়ে বিভিন্ন গন্তব্যে যাবে। এতে শহরের ব্যস্ত সড়কগুলোয় বাসের চাপ কমবে, কমবে যানজট ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কিন্তু নির্মাণের দুই দশকের বেশি সময় পরও সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি। বরং টার্মিনালটি মূলত বাস রাখার জায়গা হিসেবেই ব্যবহৃত হচ্ছে।
রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (আরডিএ) নওদাপাড়া টার্মিনাল থেকে ভদ্রা মোড় পর্যন্ত প্রায় চার কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ করে। এতে ব্যয় হয় ২৩ কোটি টাকা। পরে ২০২১ সালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন ওই সড়ক সংস্কার ও প্রশস্ত করতে ব্যয় করে আরও ৭০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। লক্ষ্য ছিল টার্মিনালের কার্যক্রম সহজ করা। এরপরও বাস যায়নি সেখানে।
এর ফলে শহরের ভেতরেই তৈরি হয়েছে একাধিক অঘোষিত বাসস্ট্যান্ড। শিরোইল বাসস্ট্যান্ড থেকে অধিকাংশ দূরপাল্লার বাস চলাচল করে। ভদ্রা, রেলগেট, তালাইমারী ও সিটি বাইপাসের বিভিন্ন পয়েন্টে রয়েছে বাসের কাউন্টার। এসব জায়গা থেকে যাত্রী ওঠানো-নামানো হয়, অনেক বাস সড়কের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। পরিবহন শ্রমিক ও নেতাদের হিসাবে, রাজশাহী থেকে প্রতিদিন প্রায় ৭৫০টি বাস চলাচল করে। এর মধ্যে প্রায় ২৩০টি ঢাকাগামী। বিভিন্ন সড়কের পাশে থামিয়ে রাখা হয় ৩০০টির বেশি বাস। ফলে নগরের ব্যস্ত সড়কের বড় একটি অংশ বাসের দখলে থাকে। এতে যানজট বাড়ে, পথচারীদের চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হয়।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন রাজশাহী জেলা সভাপতি আহমেদ সফিউদ্দিন মনে করেন, শহরের ব্যস্ত এলাকায় অস্থায়ী বাস কাউন্টার স্থাপন যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। তার মতে, বাসগুলো সড়কের অর্ধেক পর্যন্ত দখল করে রাখে। তাই দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ টার্মিনালটি চালু করা প্রয়োজন। তবে শুধু শহর থেকে বাস সরিয়ে নওদাপাড়ায় পাঠালেই সমস্যার সমাধান হবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন। কারণ টার্মিনালের বর্তমান অবকাঠামো ও পরিবেশ নিয়ে রয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের আপত্তি।
টার্মিনালের পুরো জায়গায় কাদাপানি, রয়েছে শতাধিক গর্ত, সীমানাপ্রাচীরের কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে। গেটের নিরাপত্তাব্যবস্থা অপর্যাপ্ত। রাতে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থাও নেই। যাত্রীদের জন্য অপেক্ষার জায়গা ও স্যানিটেশন সুবিধাও প্রয়োজনের তুলনায় কম।
রাজশাহী সড়ক পরিবহন গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম হেলাল বলছেন, টার্মিনাল ব্যবহারে যাত্রীদের অনাগ্রহের বড় কারণ এর দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থা ও নিরাপত্তা। শহরের মূল অংশ থেকে টার্মিনালটি প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে। সেখানে যেতে যাত্রীদের অতিরিক্ত ২০ থেকে ৩০ টাকা খরচ হয়। রাতে নিরাপত্তা নিয়েও যাত্রীদের উদ্বেগ রয়েছে।
আরডিএর কর্মকর্তাদের হিসাবে, গত পাঁচ বছরে নওদাপাড়া টার্মিনালের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে ৭০ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। গত বছর শুধু ড্রেনেজব্যবস্থা সংস্কারে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২০ লাখ টাকা।
আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান জানিয়েছেন, বিভিন্ন মহল, এমনকি রাজনৈতিক নেতারাও টার্মিনালটি কার্যকর করার চেষ্টা করছেন।



