পৌরসভার তিন গাড়ি বিক্রি করে দিয়েছেন ড্রাইভার, বাড়িতে লাগিয়েছেন এসি কিনেছেন জমি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের পাঁচটি সরকারি যানবাহনের খোঁজ মিলছিল না। এসব গাড়ির মধ্যে ছিল চারটি ডাম্প ট্রাক ও জরুরি রোগী পরিবহনের একমাত্র অ্যাম্বুলেন্স। জেলা প্রশাসনের অভিযানে দুটি ডাম্প ট্রাক ও একটি পে-লোডার উদ্ধার করা হলেও, এখনো মিলছে না দুটি ট্রাক ও অ্যাম্বুলেন্সের সন্ধান। এ ঘটনার সঙ্গে পৌরসভার গাড়িচালক কামাল হোসেনসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। তার বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে লাখ লাখ টাকা উত্তোলনেরও অভিযোগ রয়েছে।
পৌরসভার সাবেক এক চালকের দাবি, আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সময়ে ক্ষমতাসীন মেয়রের ঘনিষ্ঠ পরিচয়ে এবং পরে সরকার পরিবর্তনের পর রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কামাল হোসেন সুবিধা নিয়েছেন। কয়েক মাস আগে কামাল নিজ গ্রাম নুরুল্যাপুরে প্রায় ৪০ লাখ টাকা দিয়ে কিনেছেন জমি। বাড়িতে লাগিয়েছেন শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি)। সম্প্রতি এক আত্মীয়কে বিদেশ পাঠাতে দিয়েছেন প্রায় ১৫ লাখ টাকা। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথিপত্র দেখতে পারেননি।
পৌরসভার গ্যারেজে গিয়ে দেখা গেছে, ২০২১ সালে কেনা সাতটি ডাম্প ট্রাকের মধ্যে তিনটি রয়েছে সেখানে। সেগুলোও দীর্ঘদিন ধরে অকেজো। বাকি চারটির কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। একইভাবে গ্যারেজে পাওয়া যায়নি পৌরসভার একমাত্র আঅ্যাম্বুলেন্সটিও।
যদিও জেলা প্রশাসনের বিশেষ অভিযানে শিবপুর উপজেলার ইটাখোলা এলাকার একটি গ্যারেজ থেকে দুটি ট্রাক ও একটি পে-লোডার উদ্ধার করা হয়েছে। গত শুক্রবার চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং মোটর ওয়ার্কস গ্যারেজে চালানো হয় এই অভিযান।
ভগীরথপুর এলাকার গ্যারেজ মালিক মনুর ভাষ্য, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানের পর পৌরসভার অ্যাম্বুলেন্সটি আনা হয়েছিল তার গ্যারেজে। পরে পৌরসভার চালক কামাল হোসেন সেটি নিয়ে যান। গাড়িটি সাহেপ্রতাপ এলাকার একটি গ্যারেজে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। এরপর কোথায় গেছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। সাহেপ্রতাপ এলাকার মেকানিক নুরুল ইসলাম দাবি করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর তার গ্যারেজে মাধবদী পৌরসভার কোনো অ্যাম্বুলেন্স মেরামতের জন্য আনা হয়নি।
এই দুই বক্তব্যের মধ্যে স্পষ্ট অসংগতি দেখা দিয়েছে। পৌরসভার একমাত্র অ্যাম্বুলেন্সটি এখন কোথায় এবং কার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে-সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
পৌরসভার এক কর্মচারীর দাবি, চারটি ডাম্প ট্রাক শিবপুর উপজেলার ইটাখোলা এলাকায় মাটি বহনের কাজে ব্যবহারের জন্য বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনায় পৌরসভার চালক কামাল হোসেন, মোস্তফাসহ কয়েকজনের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করেন তিনি। অ্যাম্বুলেন্সটিও পরে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে ঢাকায়। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো নথি উপস্থাপন করেননি।
শুধু যানবাহন না, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে এসেছে। বিশেষ করে গাড়ি মেরামত ও জ্বালানি ব্যয়ের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন পৌরসভার বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র মোশাররফ হোসেন মানিকের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কামাল হোসেন সরকার পরিবর্তনের পরও প্রভাব খাটিয়ে গাড়ি মেরামতের নামে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করেছেন। অন্য চালকদেরও পৌরসভার যানবাহন চালাতে দেওয় হতো বাধা। এই প্রতিবেদকের হাতে আসা গাড়ি মেরামত ও জ্বালানির একাধিক বিল-ভাউচার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কিছু ভাউচারে উল্লেখ নেই তারিখ। আবার কিছু নথিতে কোন গাড়ির জন্য নেওয়া হয়েছে জ্বালানি তেল, সেই গাড়ির নম্বরও নেই। বিভিন্ন যানবাহন মেরামতের বিলের বিপরীতে চেক ইস্যু করা হয়েছে চালক কামাল হোসেনের নামে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কামাল হোসেন। তিনি বলেছেন, ‘৫ আগস্টের পর গাড়িগুলো নেওয়া হয়েছিল মনুর গারেজে। পরে সেগুলো কোথায় গেছে, তা জানি না আমি।’ ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরির অভিযোগ নিয়ে তার ভাষ্য, ‘এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা।’ তিনি দাবি করেন, কখনো নিজের নামে এ ধরনের কোনো বিল অফিসে জমা দেননি।
অভিযোগ ও পাল্টা বক্তব্যের মধ্যে প্রশাসনের নজর এখন তদন্তে। এর ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে অভিযোগগুলোর সত্যতা। মাধবদী পৌরসভার প্রশাসক ও নরসিংদী সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আসমা জাহান সরকার জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষে জানানো হবে বিস্তারিত। কারও কাছে এ বিষয়ে তথ্য বা প্রমাণ থাকলে তা প্রশাসনের কাছে জমা দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন তিনি।




