বরগুনায় কলেজের ভবন নির্মাণে গাফিলতির অভিযোগ, বেড়েছে ব্যয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বরগুনা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাততলা অ্যাকাডেমিক কাম ওয়ার্কশপ ভবন নির্মাণের শুরু থেকেই উঠেছে গাফিলতির অভিযোগ। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্প ব্যয় বেড়েছে ৩২ দশমিক ১০ শতাংশ। এরপর প্রথম ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তিও বাতিল হয়েছে। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে নতুন ঠিকাদার। তবে দ্বিতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়মের অভিযোগ।
নির্মাণ শেষ হওয়ার আগেই ভবনের ছাদে দেখা দিয়েছে ফাটল। কাজের জন্য ব্যবহৃত বালু ও পাথরের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। প্রাক্কলনে ওপিসি সিমেন্ট ব্যবহারের কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে পিসিসি সিমেন্ট— এমন অভিযোগও রয়েছে। ঢালাইয়ে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে কম সিমেন্ট এবং শাটারিংয়ে স্টিলের পরিবর্তে কাঠ ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
প্রকল্পের তথ্য বলছে, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উদ্যোগে ২০২০ সালে বরগুনা সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে সাততলা অ্যাকাডেমিক কাম ওয়ার্কশপ ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ১১ কোটি ৫৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। ২০২০ সালের ৩১ আগস্ট খান বিল্ডার্স অ্যান্ড হাজি এন্টারপ্রাইজকে নির্মাণকাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৭৩০ দিনের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয়নি। ওই সময়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি শুধু পাইলিংয়ের কাজ শেষ করে। এ বাবদ প্রতিষ্ঠানটিকে প্রায় ৩ কোটি ৯৭ লাখ টাকা বিলও দেওয়া হয়। এরপর নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায়।
২০২৫ সালে প্রথম ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করা হয়। এরপর ভবনের অবশিষ্ট কাজ শেষ করতে আবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। দ্বিতীয় দফায় ভবনের অবশিষ্ট নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় এসই-এনসিএল (জেভি) নামের যৌথ অংশীদারত্বের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। অবশিষ্ট কাজের ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ১১ কোটি ৩৩ লাখ ৯৩ হাজার ২৫০ টাকা। এই পর্যায়ে প্রকল্পের ব্যয় আগের তুলনায় ৩ কোটি ৭২ লাখ ৮ হাজার ২৫০ টাকা বেড়েছে। গত বছরের ২২ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়। চুক্তি অনুযায়ী ৫৪০ দিনের মধ্যে অবশিষ্ট কাজ শেষ করার কথা। কিন্তু নতুন ঠিকাদারের কাজ শুরু হওয়ার পর এবার প্রশ্ন উঠেছে নির্মাণসামগ্রী ও কাজের মান নিয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ভবন নির্মাণে নিম্নমানের বালু এবং ময়লাযুক্ত পাথর ব্যবহার করা হচ্ছে। পাথরের গায়ে লেগে থাকা কাদামাটি যথাযথভাবে পরিষ্কার না করেই তা ঢালাইয়ের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দা মো. জুলহাস মিয়ার অভিযোগ, প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতেই এসব কাজ হচ্ছে।
কাজের গুণগত মান নিয়ে উদ্বিগ্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আমিনুল ইসলাম। তার দাবি, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে ফাটল দেখা দেওয়ার বিষয়টি ঠিকাদারকে জানানো হয়েছে। তবে ঠিকাদার তাকে জানিয়েছেন, এতে তেমন কোনো সমস্যা হবে না।
ছাদের ফাটল নিয়ে উদ্বেগের কারণও ব্যাখ্যা করেছেন বরগুনা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান আব্দুর রাকিব হাসান। তার ভাষ্য, ছাদের ফাটল দিয়ে পানি ঢুকলে রডে মরিচা ধরতে পারে। এতে রড ফুলে গিয়ে ছাদের অংশে নতুন করে ফাটল সৃষ্টি হতে পারে।
তার মতে, বালু ও পাথর ভালোভাবে পরিষ্কার না করে ব্যবহার করলে সিমেন্টের সঙ্গে মাটি মিশে কংক্রিটের শক্তিমত্তা কমে যেতে পারে। এতে ভবনের স্থায়িত্বকাল কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
অভিযোগ অস্বীকার করে ঠিকাদার মো. জাকির হোসেন বললেন, ‘রোদের তাপ বেশি থাকায় ছাদে চিকন ফাটল দেখা দিয়েছিল। পানি দেওয়ার পর এখন আর সেই ফাটল নেই।’
নির্মাণকাজে সিমেন্ট কম দেওয়ার অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। তার দাবি, নিয়ম মেনেই দেওয়া হচ্ছে সিমেন্ট। তবে মাঝেমধ্যে শ্রমিকদের ভুলে সিমেন্টের পরিমাণ কম-বেশি হতে পারে।
নির্মাণকাজ তদারকির দায়িত্বে থাকা প্রকৌশলী ঈসা মিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে কাজের মান নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে বরগুনা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের ভাষ্য, নির্মাণকাজে কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কাজ ভেঙে আবার নির্মাণ করতে হবে। তদারকির দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের গাফিলতি পাওয়া গেলে তাদের বিরুদ্ধেও নেওয়া হবে ব্যবস্থা।
নির্মাণকাজ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে বরগুনার জেলা প্রশাসক তসলিমা আক্তার বলেছেন, নির্মাণকাজে কোনো ধরনের অনিয়ম করতে দেওয়া হবে না। বিষয়টি নিয়মিত তদারকের ব্যবস্থা করা হবে।



