লিবিয়ায় জিম্মি শিবচরের মেহেদী
১৭ লাখ দেওয়ার পরও মুক্তি মেলেনি, ফের ২০ লাখ দাবি

লিবিয়ায় জিম্মি মেহেদী হাসান
ইউরোপে উন্নত জীবনের আশায় লিবিয়া পাড়ি দিয়ে প্রায় তিন মাস ধরে একটি চক্রের হাতে আটক রয়েছেন মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার মেহেদী হাসান (৩০)। পরিবারের অভিযোগ, তাকে নির্যাতন করে সেই ভিডিও স্বজনদের কাছে পাঠানো হচ্ছে। মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে নতুন করে ২০ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে
মেহেদী শিবচর উপজেলার বাশকান্দি ইউনিয়নের ছলেনামা বাজিতপুর এলাকার রহমান শিকদারের ছেলে। স্থানীয় একটি কম্পিউটারের দোকানে চাকরি করতেন তিনি। পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি এবং ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্নে স্থানীয় সাগর মিয়ার মাধ্যমে বিদেশ যাওয়ার উদ্যোগ নেন মেহেদী।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ইউরোপে পাঠানোর কথা বলে সাগর মিয়ার সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। পরিবারের সামর্থ্য না থাকায় ভিটেবাড়ি বন্ধক ও ধারদেনা করে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মেহেদীকে লিবিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর কিছুদিন পরই একটি চক্র তাকে আটক করে বলে অভিযোগ পরিবারের।
স্বজনদের দাবি, মেহেদীকে আটকের পর নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠানো হয়। ভিডিও দেখে ছেলেকে বাঁচাতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তারা। একপর্যায়ে ধারদেনা করে এবং ভিটেবাড়ি বন্ধক রেখে প্রায় ১৭ লাখ টাকা পাঠানো হয়। বিপুল পরিমাণ টাকা দেওয়ার পর মেহেদীকে কিছু সময়ের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলেও পরে আবারও আটক করা হয় বলে পরিবারের অভিযোগ।
বর্তমানে প্রায় তিন মাস ধরে মেহেদী ওই চক্রের হাতে আটক রয়েছেন। তাকে মুক্ত করতে এবার আরও ২০ লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। একের পর এক টাকা দেওয়ার কারণে এরই মধ্যে পরিবারটি আর্থিকভাবে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। বসতভিটা বন্ধক, ধারদেনা ও ঋণের বোঝায় চরম সংকটে থাকা পরিবারের পক্ষে নতুন করে ২০ লাখ টাকা দেওয়া সম্ভব নয়।
মেহেদীর বাবা রহমান শিকদার ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘ছেলেকে বিদেশে পাঠানোর পর থেকেই আমাদের পরিবার নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ছেলেকে বাঁচাতে এরই মধ্যে বিপুল পরিমাণ টাকা দেওয়া হয়েছে। এখন আর আমাদের পক্ষে টাকা দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে মেহেদীকে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়, এটাই আমাদের পরিবারের একমাত্র দাবি।’
মেহেদীর মাও ছেলের নিরাপদে দেশে ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটাচ্ছেন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, তারা আর কোনো টাকা দিতে চান না। তাদের একমাত্র চাওয়া, মেহেদী যেন জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরে আসেন।
এ বিষয়ে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচ এম ইবনে মিজান বলেন, অবৈধভাবে বিদেশ গমন ব্যক্তি ও দেশের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মানবপাচার ও অবৈধ অভিবাসন প্রতিরোধে উপজেলা প্রশাসন জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণে সর্বদা সচেষ্ট রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, অবৈধ অভিবাসন ও মানবপাচার রোধে শুধু প্রশাসনের উদ্যোগই যথেষ্ট নয়। জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ জনগণের সম্মিলিত সচেতনতা ও সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
স্বজনদের আশঙ্কা, সময় যত গড়াচ্ছে, মেহেদীর নিরাপত্তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ তত বাড়ছে। তাই দেরি না করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, লিবিয়ায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে পরিবার।
তাদের আকুতি, ‘আর কোনো টাকা নয়, আমরা শুধু আমাদের সন্তানকে নিরাপদে দেশে ফিরে পেতে চাই।’





