পাহাড়ের বাতাসে এখন কফির সুবাস

ছবি: আগামীর সময়
একসময় পাহাড়ি অঞ্চলের প্রধান পরিচয় ছিল জুমচাষ, ফলের বাগান কিংবা বনজ সম্পদ। তবে সময়ের সঙ্গে সেই পরিচয়ে যুক্ত হয়েছে নতুন এক সম্ভাবনার নাম ‘কফি’। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি ঢালে এখন শুধু সবুজের সমারোহ নয়, বাতাসে ভেসে বেড়ায় কফির সুবাসও। কৃষকদের আগ্রহ, গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্যোগে ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে পাহাড়ি কফির নতুন এক অর্থনীতি।
খাগড়াছড়ি জেলা সদরের একটি কফিশপে ব্যস্ত সময় পার করছেন মো. জামাল উদ্দিন। স্থানীয় কফি চাষিদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা কফি ফল নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করে তিনি পরিবেশন করেন গ্রাহকদের। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত এই কফির স্বাদ ও ঘ্রাণে মুগ্ধ ক্রেতারাও।
পাহাড়ে কফি চাষ নতুন কোনো বিষয় নয়। কয়েক দশক ধরেই বিভিন্নভাবে কফি চাষ জনপ্রিয় করার চেষ্টা হয়েছে। তবে উৎপাদন ভালো হলেও কফি প্রক্রিয়াজাতকরণে অভিজ্ঞতার অভাবে সেই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ও পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের যৌথ উদ্যোগে নেওয়া প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা ও কফি চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ফলে এখন কফি উৎপাদনের পাশাপাশি অনেক কৃষক নিজেই কফি প্রক্রিয়াজাত করে বাজারজাত করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, খাগড়াছড়ি জেলায় বর্তমানে প্রায় ১৮৮ হেক্টর জমিতে কফি চাষ হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় গড়ে ওঠা বাগানগুলোতে গত বছর থেকে বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়েছে। কফি গাছ সাধারণত রোপণের তিন বছর পর ফল দিতে শুরু করে এবং পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যেতে সময় লাগে ছয় থেকে সাত বছর।
বিশ্বে কফির নানা জাত থাকলেও বাংলাদেশে মূলত অ্যারাবিকা ও রোবাস্টা জাতের কফি চাষ করা হয়। কফি গাছের রোগবালাই তুলনামূলক কম, আলাদা জমির প্রয়োজন হয় না এবং আম, লিচু, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফলের বাগানে সাথী ফসল হিসেবে চাষ করা যায়। সেচের প্রয়োজনও কম হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে এর জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ছয় কেজি তাজা কফি ফল থেকে প্রায় এক কেজি শাঁসযুক্ত কফি বিন পাওয়া যায়। পরে প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে তা উন্নতমানের কফিতে রূপান্তরিত হয়। তবে কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ বজায় রাখতে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় রোস্টিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ পর্যায়ে দক্ষতার অভাব থাকলে কফির মান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
খাগড়াছড়ি শহরের পাশের আলুটিলা পাহাড়ের কফিচাষি জীতেন ত্রিপুরা বলেছেন, ‘কফি চাষ লাভজনক। তবে কৃষকদের আরও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। পাশাপাশি কফি প্রক্রিয়াজাতকরণের যন্ত্রপাতি সরবরাহ কিংবা সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
জীতেন ত্রিপুরার আলুটিলা পর্যটন এলাকায় একটি কফিশপও রয়েছে। তিনি নিজেই কফি ফল সংগ্রহ থেকে শুরু করে ফ্রেশ কফি বিন তৈরির কাজ করেন। পরে পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে গিয়ে নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় কফি রোস্ট করে এনে তা গুঁড়ো করে গ্রাহকদের পরিবেশন করেন।
খাগড়াছড়ি শহরের একটি কফিশপে কথা হয় তরুণ উদ্যোক্তা রিক্তন চাকমার সঙ্গে। বলেছেন, ‘কফির আসল স্বাদ ও ঘ্রাণ নিতে আমি এখানে আসি। অর্গানিক কফির সুবাসই আলাদা। খাগড়াছড়ির কফি এত ভালো মানের হতে পারে, এটা ভাবতেই গর্ব হয়।’
কফি বিক্রেতা মো. জামাল উদ্দিন জানান, চলতি বছর তিনি স্থানীয় বাগানিদের কাছ থেকে প্রায় ৩৫০ কেজি কফি সংগ্রহ করেছেন। ধীরে ধীরে কফির চাহিদা বাড়ছে এবং কৃষকরাও এর সুফল পাচ্ছেন।
খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দিন চৌধুরী বলেছেন, ‘পাহাড়ের আবহাওয়া কফি চাষের জন্য খুবই উপযোগী। প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের জন্য গ্রুপভিত্তিক কফি সেড নির্মাণ করা হয়েছে, যেখানে পাল্পিং ও হাস্কিং মেশিন রয়েছে। এসব যন্ত্র কফি প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তা করছে।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘কফি ফল সংগ্রহের পর দ্রুত বিক্রি করে দিলে কৃষকরা বাড়তি ঝামেলা এড়াতে পারবেন এবং ভালো দামও পাবেন।’
দেশে কফির চাহিদা দিন দিন বাড়লেও এর বেশিরভাগই এখনও আমদানিনির্ভর। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৯৫ শতাংশ কফি বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ৬২ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ৬৭ টন কফি উৎপাদিত হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা এবং বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত করা গেলে পাহাড়ি কফি একদিন দেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় কৃষিপণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। আর তখন হয়তো খাগড়াছড়ির পাহাড় শুধু সবুজের জন্য নয়, কফির সুবাসের জন্যও পরিচিত হবে দেশজুড়ে।






