‘আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হলে সরকারের পদত্যাগ করা উচিত’

খুলনা প্রেস ক্লাবে জামায়াতে ইসলামীর সংবাদ সম্মেলন
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ব্যর্থ হলে পদত্যাগ করা উচিত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল সহকারী পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক।
তিনি বলেছেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকারকে আন্তরিক হতে হবে। তা করতে ব্যর্থ হলে সরকারের পদত্যাগ করা উচিত। আমরা আন্দোলন করছি, পরবর্তী সিদ্ধান্ত জনগণই নেবে।
আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি, চাঁদাবাজি বন্ধ, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ সাত দফা দাবিতে ১১ দলীয় ঐক্যের ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ উপলক্ষে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
খুলনা মহানগরীর ঐতিহাসিক বাবরী চত্বর (শিববাড়ী) ও ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডে অনুষ্ঠেয় পথসভা সফল করার লক্ষ্যে ১১ দলীয় ঐক্য, খুলনার উদ্যোগে এটি অনুষ্ঠিত হয়।
এই সংসদ সদস্য বলেছেন, ‘খুলনার মানুষ এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। কখন, কোথায় বোমা বিস্ফোরণ, গুলি কিংবা হত্যাকাণ্ড ঘটছে, তা নিয়ে মানুষের মধ্যে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা রয়েছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাপন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মানুষের চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সরকার ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলিষ্ঠ পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব।’
সরকারের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘দলীয়করণ, চাঁদাবাজি এবং জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে। সরকার গঠনের মাত্র সাত-আট মাসের মধ্যে কেন লংমার্চের মতো কর্মসূচি নিতে হচ্ছে, সেটিও সরকারের জন্য প্রশ্ন। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে জনঅসন্তোষ বাড়বে।’
খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির দায়িত্ব সরকারের। জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সম্প্রতি পুলিশ কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। চাঁদাবাজি, মাদক ও কিশোর গ্যাং নিয়ন্ত্রণে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। সরকার ব্যর্থ হলে এর দায় তাকেই নিতে হবে। এসব দাবিতে কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে আরও কর্মসূচি নেওয়া হবে।’
১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা জানান, গণভোটে প্রাপ্ত গণরায়ের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি, জনদুর্ভোগ নিরসন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণসহ সাত দফা দাবিতে এ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, কিশোর গ্যাং ও জননিরাপত্তার বিষয়গুলোও কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাবে।
সংবাদ সম্মেলনে নেতারা অভিযোগ করেন, সন্ত্রাসী, দুর্নীতিবাজ ও মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তারের পর সহজেই জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টি উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় বিষয়টি তুলে ধরলে পুলিশ জানিয়েছে, মামলা যথাযথভাবে প্রস্তুত করা এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আলামত উপস্থাপনে ঘাটতি থাকায় আসামিরা জামিন পেয়ে যান। এ সমস্যা মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়নের প্রস্তাব সরকারের কাছে দেওয়া হয়েছে বলে জানান তারা।
১১ দলের লংমার্চ বাস্তবায়ন কমিটি, খুলনার আহ্বায়ক ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য এবং মহানগরী আমির মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান বলেন, লংমার্চ শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, জনগণের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক দাবি তুলে ধরার গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়েছে। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় এ কর্মসূচি ভূমিকা রাখবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মাহফুজুর রহমান জানান, ৩১ অক্টোবরের লংমার্চ উপলক্ষে খুলনা মহানগরীর বাবরী চত্বরের (শিববাড়ী) পথসভায় লক্ষাধিক এবং ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডের পথসভায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের সমাগম হবে বলে তারা আশা করছেন। কর্মসূচি বাস্তবায়নে ১৭টি উপকমিটি গঠন করা হয়েছে। শৃঙ্খলা রক্ষায় দায়িত্ব পালন করবেন ১ হাজার ২৬৬ জন স্বেচ্ছাসেবক।
তিনি জানান, শনিবার সকাল ৭টায় ঢাকার বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে সমাবেশের পর সকাল ৮টায় গাড়িবহর যাত্রা করবে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বাগেরহাটের কাটাখালি মোড়ে পথসভা হবে। দুপুর সাড়ে ১২টায় খুলনা মহানগরীতে এবং সোয়া ২টার দিকে ফুলতলা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। এসব কর্মসূচিতে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত থাকবেন। পরে গাড়িবহর যশোরের মুরলী মোড় ও চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ডে পথসভা করে কুষ্টিয়ায় সমাবেশের মাধ্যমে লংমার্চের তৃতীয় দফা শেষ করবে। কুষ্টিয়ার সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান।
প্রচার-প্রচারণার বিষয়ে মাহফুজুর রহমান বলেন, ‘লংমার্চের বার্তা গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে ব্যাপক প্রচার চালানো হচ্ছে। এ জন্য পোস্টার, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন, ব্যানার ও বিলবোর্ড প্রস্তুত করা হয়েছে। এ ছাড়া কুদির বটতলা, রূপসা সেতু, জিরো পয়েন্ট, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে, গল্লামারী, ময়লাপোতা মোড়, জোড়াগেট, বৈকালী, নতুন রাস্তা, দৌলতপুর, ফুলবাড়িগেট, শিরোমণি, অফিস গেট ও ফুলতলা থানাসহ বিভিন্ন স্থানে ২০টি তোরণ নির্মাণ করা হয়েছে।’
পথসভা সফল করতে মূল অনুষ্ঠানস্থলে ৪৫ বাই ২৪ বর্গফুটের একটি মঞ্চ নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে বলে জানান তিনি। আমন্ত্রিত অতিথি, সাংবাদিক ও দূরদূরান্ত থেকে আসা অংশগ্রহণকারীদের সুবিধার্থে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শব্দব্যবস্থাপনার জন্য দুই শতাধিক হর্নসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা হয়েছে।
লংমার্চ চলাকালে যানজট এড়াতে ট্রাফিক বিভাগ বিশেষ কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে বলেও জানান মাহফুজুর রহমান। আগত যানবাহনের জন্য পৃথক পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ জন্য জোড়াগেট সিএন্ডবি কলোনির মাঠ, সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল ও ময়ূরী আবাসিক এলাকাকে প্রধান পার্কিং স্পট হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে স্বেচ্ছাসেবকেরা দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক অধ্যক্ষ মো. ইজ্জত উল্লাহ এমপি, খুলনা অঞ্চল টিমের সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এমপি, এনসিপির মহানগর আহ্বায়ক আহম্মদ হামিম রাহাত, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহানগর সভাপতি মুফতি শরীফ সাইদুর রহমান, লেবার পার্টির সভাপতি অধ্যক্ষ মো. সাইফুদ্দোহা, বিডিপির মহানগর সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. হানিফ উদ্দিন, জাগপার সভাপতি খান মো. রাশেদ এবং মহানগরী জামায়াতের নায়েবে আমির অধ্যাপক নজিবুর রহমানসহ ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা।



