গৌরীপুরে হারিয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, বাড়ছে জলাবদ্ধতা

ছবি: আগামীর সময়
একসময় ময়মনসিংহের গৌরীপুর উপজেলার খাল-বিল ছিল কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও নৌযোগাযোগের প্রাণ। কিন্তু দখল, ভরাট, অবৈধ স্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় উপজেলার শতাধিক খাল-বিলের অধিকাংশই এখন বিলুপ্ত বা অস্তিত্ব সংকটে। ফলে বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সংকটে ভুগছেন লাখো মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর খাল-বিল দখল হলেও নেওয়া হয়নি কার্যকর ব্যবস্থা। বর্তমানে সরকার খাল খননে গুরুত্ব দেওয়ায় সক্রিয় হয়েছে প্রশাসন। তবে এরই মধ্যে ভূমিদস্যুদের দখলে চলে গেছে অধিকাংশ খাল-বিল।
তথ্য অনুযায়ী, একসময় অসংখ্য খাল ছিল উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে। মইলাকান্দা ইউনিয়নের সানজালকান্দা ও বগাদিয়া খাল প্রায় বিলুপ্ত। কোনোমতে টিকে আছে লংকা খাল। অচিন্তপুর ইউনিয়নের মুখুরিয়া, নয়াখাল ও চৌমনি খাল বিলুপ্তির পথে। লংকা খালও দখল ও ভরাটের কারণে সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
মাওহা ইউনিয়নের ঘোষখালি, সুরিয়া নদীর সংযোগ খাল, ধেরুয়া, কড়েহা, লুনাপাড়া ও বাউশালী খাল হারিয়ে ফেলেছে নাব্যতা। সহনাটি ইউনিয়নে অস্তিত্ব মুছে গেছে অধিকাংশ খালের। বোকাইনগর ইউনিয়নের মাইজহাটি, চাকুরীয়া ও ধনিয়া খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হলেও এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়েছে ছোট অনেক খাল।
রামগোপালপুর ইউনিয়নের ডুবলী, ক্যাইলা বিলের খাল, ভবানীপুর ও সাপমরা খাল দখল ও ভরাটের কারণে বিলুপ্তির পথে। ডৌহাখলা ইউনিয়নের আহসানপুর, রুকুন্দিপুর নগুয়া, সতিষা, চরঘোড়ামারা, ডৌহাখলা, মাইজহাটি, বলরামপুর, বেতবান্দি ও একই সংকটে রয়েছে পায়রা খালও।
পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদের তীরবর্তী ভাংনামারী ইউনিয়নের খুলিয়ার চর, চরভাবখালি ও মাঝেরটেক খালসহ অনন্তগঞ্জ, ভাটিপাড়া, বয়রা ও খোদাবক্সপুর এলাকার ছোট ছোট খাল দীর্ঘদিন খনন না হওয়ায় নাব্যতা হারিয়েছে।
একসময় প্রায় দুই ডজন খাল ছিল গৌরীপুর পৌরসভায়। বর্তমানে সতিষা, বালুয়া, নয়াপাড়া ও ভালুকা খাল কোনোমতে টিকে আছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এগুলোও ধীরে ধীরে দখল হয়ে গেলেও উদ্ধার বা নেওয়া হয়নি খননের কার্যকর উদ্যোগ।
পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর মো. ফারুকুজ্জামান জানিয়েছেন, একসময় পৌর শহরে ছোট-বড় মিলিয়ে খাল ছিল প্রায় অর্ধশত। ভালুকা খাল থেকে বর্তমান মাছ মহাল পর্যন্ত একটি বড় খাল দিয়ে মহাজনি নৌকা চলাচল করত। এখন সেই খাল সম্পূর্ণ বিলুপ্ত।
তার ভাষ্য, প্রভাবশালীদের দখলে চলে গেছে অধিকাংশ খালই।
প্রবীণ বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গৌরীপুরে একসময় সিধলং, ডালিয়া, বড় বিল, শাপলা বিল, কচুরি বিল, বাউশালী বিল, দিঘা বিল, বক্সী বিল, কাজলা বিল, সিংড়া বিল, চৌকা বিল, বলেশ্বর বিল, সানজাল বিল, ইছুলিয়া বিল, কুমাইরা বিল, চান্দের বিল, খট্রিয়াপুরী বিল, বৈদা বিল ও মইল্যা বিলসহ ছিল অসংখ্য বিল।
এ ছাড়া জলবুরুঙ্গা নামে একটি জলমহালও রয়েছে। এসব বিলে একসময় প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া গেলেও বর্তমানে ফিশারিতে রূপ নিয়েছে অধিকাংশ বিল।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের কাগজে-কলমে অনেক খাল-বিলের অস্তিত্ব থাকলেও বাস্তবে সেগুলো নেই।
অভিযোগ রয়েছে, সিএস ম্যাপে খাল হিসেবে থাকা অনেক জায়গা বিআরএস ম্যাপে পরিবর্তিত দেখানো হয়েছে। এতে দখলদাররা সেসব জায়গা নিজেদের সম্পত্তি দাবি করছেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, শ্রেণি পরিবর্তনের সঙ্গে ভূমি কার্যালয়ের অসাধু কিছু কর্মকর্তা জড়িত।
এ ছাড়া যেসব খাল এখনো দৃশ্যমান, সেগুলোর পানিপ্রবাহ বন্ধ করে বিভিন্ন স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে ফিশারি। ফলে খালগুলোর নষ্ট হয়েছে স্বাভাবিক প্রবাহ। এর প্রভাব পড়ছে কৃষি ও জনজীবনে। বর্ষায় সৃষ্টি হচ্ছে তীব্র জলাবদ্ধতা, আর শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিচ্ছে সেচ সংকট।
রামগোপালপুর গ্রামের আব্দুল আজিজ জানিয়েছেন, ১৫ থেকে ২০ বছর আগেও এসব খালে নৌকা চলাচল করত এবং পণ্য পরিবহন করতেন ব্যবসায়ীরা। এখন পানির প্রবাহই নেই খালগুলোতে। ফসল তলিয়ে যায় সামান্য বৃষ্টিতেই।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আফিয়া আমীন পাপ্পা জানিয়েছেন, সিএস ম্যাপে শতাধিক খাল-বিল থাকলেও অনেকগুলোর অস্তিত্ব নেই বিআরএস ম্যাপে। ফলে আইনি জটিলতার কারণে সেগুলো উদ্ধার বা খনন করা সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমানে সরকার দুটি খাল খনন করছে এবং প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে আরও ১২টি খাল খননের জন্য।
তিনি আরও জানান, প্রয়োজনীয় সরকারি নির্দেশনা পেলে দখল ও উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বিলুপ্ত খাল-বিল আইনি প্রক্রিয়ায়।





