রঙ যার গোলাপি, নাম তার লাল

ছবি: আগামীর সময়
রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস এখন প্রকৃতির রঙে রঙিন। কৃষ্ণচূড়া, জারুল, স্বর্ণচাঁপা, কনকচাঁপা, নীলমণিসহ নানা ফুলে ঝলমলে চারপাশ। তবে ক্যাম্পাসের স্বাধীনতা স্মারকের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছ যেন নজর কাড়ছে একটু বেশিই। কারণ এতে ফুটেছে দুর্লভ লাল সোনালু। লাল সোনাইল নামেও পরিচিত এটি।
নামে লাল হলেও ফুলগুলোর রঙ অনেকটাই গোলাপি। তাই একে গোলাপি ঝরনাও বলা হয়। এর খটমটে বৈজ্ঞানিক নাম ক্যাসিয়া জাভানিকা।
সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি ফুলগুলো অনায়াসেই ছড়াচ্ছে মুগ্ধতা। এর চোখ ধাঁধানো আভায় এক মুহূর্তের জন্য হলেও থমকে দাঁড়ান পথচারীরা। অনেকের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডে নান্দনিকতা জুড়ে দিচ্ছে লাল সোনালু।
এ গাছের আদ্যোপান্ত জানালেন বাংলা একাডেমির সহপরিচালক ও রংপুরের বেগম রোকেয়া স্মৃতিকেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না।
তার তথ্য, বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিলের মধ্যে ফোটে লাল সোনাইলের ফুল। তবে বিভিন্ন দেশে জলবায়ুভেদে এর ফুল ফোটার সময় ভিন্ন। এর আদি নিবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলের বাগানে এর জন্ম। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়াসহ উষ্ণমণ্ডলীয় এলাকায় এ ফুল ফোটে। দ্রুত বর্ধনশীল এই ফুলগাছ ৮-১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। লাল সোনাইল বা লাল সোনালু বলা হলেও এর ফুলে গোলাপি রঙের আভাই বেশি।
সৌন্দর্যের পাশাপাশি ভেষজ উপকারিতাও আছে লাল সোনাইলের। কৃষিবিদ আবিদ জানালেন, কোষ্ঠকাঠিন্য ও ক্লোরোসিসের চিকিৎসায় এর ব্যবহার হতো প্রাচীনকালে। ‘এ গাছের পাতা হার্পিস সিমপ্লেক্সের (ভাইরাল সংক্রমণ) বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর ছাল বা বাকল আয়ুর্বেদিক ও অন্য ট্রাডিশনাল ওষুধের অ্যান্টিডায়াবেটিক ফর্মুলেশনের অন্যতম উপাদান। পাশাপাশি এর ছাল ব্যবহার হয় ট্যানারিশিল্পে।’
লাল সোনাইল গাছের নিচে আলাপ হলো বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও গাছপ্রেমী ড. তুহিন ওয়াদুদের সঙ্গে। ক্যাম্পাসে চার শতাধিক প্রজাতির প্রায় ৩৭ হাজার গাছ লাগিয়েছেন তিনি। বললেন সেই গল্প।
‘গাছগুলো সংগ্রহে বিভিন্নজন সহযোগিতা করেছেন। কেউ গাছ কিনে দিয়েছেন, শিক্ষার্থী-কর্মচারীরা গাছের পরিচর্যা করে সহযোগিতা করেছেন। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব দুর্লভ গাছের চারা লাগানো হয়েছে, সেগুলো সংগ্রহ করতে সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা করেছেন নিসর্গবিদ মোকাররম হোসেন... তার মধ্যে একটি হচ্ছে লাল সোনাইল গাছ। এই ক্যাম্পাসে লাগানো তিনটি লাল সোনাইল গাছের মধ্যে দুটিতে ফুল ফুটছে। আশা করছি, অন্যটিতে আগামী বছর ফুটবে।’
‘লাল সোনাইল ফুল অন্য রকম হওয়ায় এর দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে হয়’— মুগ্ধতার বর্ণনা দিলেন ড. তুহিন। ‘এই ফুল ফোটার ধরনটাও আলাদা। গাছের গড়ন, সৌন্দর্যও দারুণ। চারদিকে লম্বা ডাল ছড়িয়ে যায়, ডালের ওপর বরাবর ফুল ফুটে থাকে। দেখে মনে হয়, কেউ একের পর এক সাজিয়ে দিয়েছে ফুলগুলো।’
হাজারও ফুলের ভিড়ে অনেকে শুধু এই দুর্লভ লাল সোনাইল দেখতে ক্যাম্পাসে আসছেন, জানালেন তিনি। ‘রংপুরে যেহেতু ভালো ফুল হচ্ছে, তাই বোঝা যাচ্ছে এখানকার মাটি ও আবহাওয়ায় এই গাছ দারুণভাবে মানিয়ে নিয়েছে।’
দুর্লভ এই ফুলগাছ দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা আছে এই গাছপ্রেমীর। ‘লাল সোনাইল বাংলাদেশে খুব একটা দেখা যায় না। রাজশাহীতে কয়েকটা গাছ দেখেছি। ঢাকায় এখন লাগানো হচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও আছে। তবে বীজ থেকে এই গাছ উৎপাদন করা যায়। তাই আমরা ভেবেছি, এবার যদি বীজ পাই, তাহলে অনেক মানুষের কাছে বিতরণ করব; যাতে ছড়িয়ে পড়ে গোলাপি আভার দুর্লভ এই লাল সোনাইল।’






