শেবাচিম হাসপাতালে ‘লাশ-বাণিজ্য’

সংগৃহীত ছবি
লাশঘরের সামনে হাউমাউ করে কাঁদছিলেন কয়েক ব্যক্তি। তাদের মধ্যে ছিলেন একমাত্র সন্তান হারানো মা-বাবাও। বুক ফেটে যাচ্ছিল আহাজারি-আর্তচিৎকারে। হঠাৎ করেই আবার নীরবতা। চোখ মুছলেন, তাকিয়ে রইলেন আকাশে। ডোমঘরের সেবক এসে যখন মরদেহটির জন্য কুড়ি হাজার টাকা দাবি করলেন— অধিক শোকে পাথর স্বজনরা। এটি বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ (শেবাচিম) হাসপাতালের নিয়মিত চিত্র বলে অভিযোগ।
শোকে মুষড়ে যাওয়ায় কথা বলতে পারছিলেন না শিশুটির মা-বাবা। কাঁদতে কাঁদতে ভোগান্তি ও অরাজকতা তুলে ধরলেন শিশুর দাদি ফজিলা বেগম। পানিতে পড়ে অচেতন হওয়া শিশুকে নিয়ে এসেছিলেন জেলার মুলাদী থেকে। গত ৯ জুন দুপুর ১টার দিকেই মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। ২টার মধ্যে শেষ হয় মরদেহের অন্য আনুষ্ঠানিকতা। কিন্তু মরদেহ বুঝিয়ে না দিয়ে ঘরে তালা মেরে নিরুদ্দেশ হন সেবকরা। ঘণ্টাখানেক পর এলেন মোখলেস মিয়া, মরদেহ চাইলে দাবি করেন ২০ হাজার টাকা।
‘আমরা বলি— সকাল থেকে নাওয়া-খাওয়া হয়নি, বাড়ি যাওয়ার ভাড়া ছাড়া সঙ্গে নেই কোনো টাকা। এত টাকা কীভাবে দেব? প্রশ্ন শুনে আবার তালা দিয়ে নিরুদ্দেশ হন মোখলেস, ফেরেন সন্ধ্যার পর। টাকা দিতে না পারায় রাত ১১টা পর্যন্ত চলল টালবাহানা’— যোগ করলেন তিনি।
আরেক সেবকের নাম উল্লেখ করলেন হাসপাতালে ভর্তি এক রোগীর স্বজন সালমা ইসলাম। তার অভিযোগ, রাত ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন অন্য সেবক আলমগীর হোসেন হাওলাদার। তিনি অর্থের পরিমাণ কমিয়ে করলেন ১ হাজার ৬০০ টাকা। তাও দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় চটে যান সেবকরা। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ হন অন্য রোগীর স্বজনরা। মোখলেসকে মারধর শুরু করলে উদ্ধার করেন আনসার সদস্যরা; কিন্তু তার কোনো শাস্তিই হয়নি।
এক সপ্তাহ ধরে হাসপাতালে ভর্তি শিশুসন্তানের পাশে আছেন ব্যাংক কর্মকর্তা ফাহিম। ‘আমি যে কদিন রয়েছি তাতে প্রতিদিন কম করে হলেও দিনে দুবার এই লাশের দেনদরবার নিয়ে ঝামেলা দেখেছি। টাকা না পেলে মরদেহ ছাড়েন না দুই সেবক। একদিকে স্বজন হারানোর বেদনা, অন্যদিকে লাশ নিয়ে বাণিজ্য। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে এত বছর ধরে যে অর্থ আদায়ের বিষয়টি কি হাসপাতালের পরিচালক জানেন না? সবই জানেন; কিন্তু ব্যবস্থা নেন না কেউ’— হাসপাতালের নিয়মিত চিত্র তুলে ধরলেন তিনি।
গণমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকায় নাম প্রকাশ না করে হাসপাতালের এক ওয়ার্ডবয় জানালেন, মোখলেস ও আলমগীর হাসপাতালের কর্মচারী নন। কয়েক কর্মকর্তার যোগসাজশে এ কাজ করেন তারা। হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে মর্গে লাশ আনা-নেওয়ার কাজ করে নিয়মিত অভিভাবকদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতাচ্ছেন এই দুই অবৈধ সেবক।
হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক দাবি করে মোখলেসের ব্যাখ্যা, ‘আমি কোনো বেতন পাই না। স্বজনদের কাছ থেকে টাকা না পেলে আমার পেট চলবে কীভাবে? আমি তো লাশঘর পরিষ্কার করা, মর্গে আনা-নেওয়ার কাজ করি। টাকা না নিলে চলব কীভাবে?’
মোখলেসদের পক্ষে সাফাই গাইলেন হাসপাতালের এক চিকিৎসক। তার ভাষ্য, ‘হাসপাতালে জনবল সংকট সারা দেশে। এভাবেই জোড়াতালি ও বহিরাগতদের দিয়ে চলছে সেবা কার্যক্রম। যেহেতু বহিরাগতদের বেতন নেই, সেহেতু তারা তো রোগীর স্বজনদের কাছ থেকেই টাকা-পয়সা নেবে। তারা তো ফ্রি কাজ করবে না।’
নিয়মিত বহিরাগতদের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে উল্লেখ করে সহকারী পরিচালক আবদুল মুনয়েম সাদের দাবি, গত সপ্তাহেও দুই শতাধিক বহিরাগতকে বের করে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু হাসপাতালের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এর সঙ্গে জড়িত থাকায় নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তাদের দৌরাত্ম্য।
তবে আউটসোর্সিংয়ের সুযোগ থাকলেও লাশ আনা-নেওয়ার জন্য লোকবল নিয়োগ না দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেন ওই সহকারী পরিচালক।


