কুড়িগ্রামে গরিবের নামে কোটি টাকা লেনদেন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভিক্ষা করে কোনোমতে দিন কাটে নবিরন বেগমের। নিজের কোনো ভিটেমাটি নেই; কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার পাঁচগাছী ইউনিয়নের ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পে অন্যের ঘরে থাকেন। অথচ তার নামেই একটি ব্যাংক হিসাবে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে ৯০ লাখ ২৪ হাজার ২৮২ টাকা। নবরিনের দাবি, তিনি কখনো ওই ব্যাংকে যাননি, হিসাবও খোলেননি। ভাতা ও গরু-ছাগল দেওয়ার কথা বলে তার জাতীয় পরিচয়পত্র, ছবি ও আঙুলের ছাপ নিয়েছিল একদল তরুণ। এরপর তার অজান্তেই সেই পরিচয়ে খোলা হয় ব্যাংক হিসাব। শুধু নবরিন নন, ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের আরও কয়েকজন দরিদ্র মানুষের নামে সদর উপজেলার পূবালী ব্যাংকের ঘোষপাড়া শাখায় হিসাব খুলে ১ কোটি ১৩ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।
ভুক্তভোগীদের বক্তব্য, তারা কখনো ওই ব্যাংকে যাননি। ব্যাংকটি কোথায়, সেটিও তারা জানেন না। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) ফটোকপি, ছবি ও আঙুলের ছাপ নেওয়ার পর এসব তথ্য ব্যবহার করে হিসাব খোলা হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের। এ ঘটনায় তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন আদালতে মামলা করা হয়েছে। মামলার খবর জানতে পেরে এখন গ্রেপ্তার ও আইনি হয়রানির আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
ধরলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের দাবি, চলতি বছরের জুলাইয়ের শুরুতে একদিন কয়েকজনের বাড়িতে পুলিশ গেলে তারা প্রথম জানতে পারেন, তাদের নামে প্রতারণা বা অর্থ আত্মসাতের মামলা করা হয়েছে। তখনই ব্যাংক হিসাবের বিষয়টিও তাদের সামনে আসে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা নবিরন বেগমের বয়স আশির কাছাকাছি। স্বামীহারা এই নারীর নামে পূবালী ব্যাংকের ঘোষপাড়া শাখায় খোলা হিসাবে প্রায় ৯০ লাখ টাকার লেনদেন হয়েছে। নবরিন বেগমের ভাষ্য, ব্যাংক হিসাব খোলা বা সেখানে এত টাকা লেনদেনের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না। পুলিশের ভয়ে দিন কাটছে তার।
একই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আহিনা বিবির নামেও খোলা হয়েছে ব্যাংক হিসাব। ওই হিসাবে প্রায় ২৩ লাখ টাকা লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভাষ্য, দুই তরুণ ভাতা করে দেওয়ার কথা বলে এনআইডি ও ছবি নিয়েছিল। কয়েক মাস আগে চট্টগ্রাম থেকে ২৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগসংবলিত একটি নোটিস পাওয়ার পর তিনি বিষয়টি জানতে পারেন।
এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের নামে ব্যাংক হিসাব খোলার ঘটনা নতুন নয়। গত বছর রাজবাড়ীতে এক ইমামের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে একই প্রকল্পের বাসিন্দা আনছার আলীর বিরুদ্ধে। ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাকে এক সপ্তাহ কারাগারেও থাকতে হয়। পরে গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হলে পূবালী ব্যাংক কর্তৃপক্ষ টাকা পরিশোধ করে এবং আনছার আলীর বিরুদ্ধে করা মামলাটি সমাধান করে দেয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এবার তার স্ত্রী ফরিদা বেগমের নামে একই শাখায় ব্যাংক হিসাব খোলার তথ্য পাওয়া গেছে। ফরিদা বেগমের দাবি, স্বামীকে একবার জেল খাটতে হয়েছে। এবার তার নামেও মামলা হয় কি না, সেই আতঙ্কে আছেন। তারা এই হয়রানি থেকে মুক্তি চান।
আরেক বাসিন্দা শেফালী বেগম মানুষের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করেন। তার নামেও একই শাখায় ব্যাংক হিসাব খুলে প্রায় ৭৫ হাজার টাকা লেনদেন করা হয়েছে। তার দাবি, এ হিসাব সম্পর্কেও তিনি কিছু জানেন না। ব্যাংকে গিয়ে বিষয়টি জানানোর চেষ্টা করেছেন; কিন্তু সেখানে তার কথা কেউ গুরুত্ব দিয়ে শোনেননি। ব্যাংকের এক কর্মী তাকে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করার কথা বলেছেন।
ব্যাংক হিসাবের তথ্য অনুযায়ী, নবিরন বেগমের হিসাবে হওয়া ৯০ লাখ ২৪ হাজার ২৮২ টাকার লেনদেনের বেশিরভাগই অনলাইনে হয়েছে। একটি হিসাব থেকে অন্য হিসাবে টাকা স্থানান্তরের ঘটনাও রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় কুড়িগ্রাম জজ কোর্টের আইনজীবী ফারুক হোসেন সেতুর সঙ্গে। তিনি মনে করেন, এ ধরনের ভুয়া বা প্রতারণার মাধ্যমে খোলা ব্যাংক হিসাব হুন্ডি, অনলাইন জুয়া, মাদক ও চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধে ব্যবহারের ঝুঁকি রয়েছে। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।
ব্যাংক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করছে সিআইডি। যদিও পূবালী ব্যাংকের কুড়িগ্রাম শাখার ব্যবস্থাপক এ এইচ এম আলমগীর কবির এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি। তবে তিনি বললেন, ‘এ ঘটনায় আদালতে দুটি মামলা করা হয়েছে এবং মামলাগুলো সিআইডি তদন্ত করছে।’



