পায়ে বেড়ি চোখে মুক্তির স্বপ্ন

১৫ বছর শিকলবন্দি মিতু
‘সখী তোমারে করি মানা, আমার পায়ে বেড়ি দিও না’— এটি মূলত জনপ্রিয় আধ্যাত্মিক গানের কলি। বাস্তবে এমন ঘটনা চোখে পড়েছে সাতক্ষীরার তালা উপজেলায়। প্রায় ১৫ বছর পায়ে ডান্ডাবেড়ি নিয়ে জীবনযাপন করছেন ২৪ বছর বয়সী মিতু। দীর্ঘ বন্দিজীবনের ভার পায়ে নিয়েও তার চোখে এখনো জেগে আছে মুক্ত ও স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন। চিকিৎসকরাও বলছেন, চিকিৎসা ও পরিচর্যা পেলে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে তার।
মিতুর বাড়ি তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নের প্রসাদপুর গ্রামের মোড়লপাড়ায়। ছোটবেলা থেকেই মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন তিনি। কখনো কখনো বাড়ি থেকে বের হয়ে এদিক-সেদিক চলে যেতেন। একপর্যায়ে তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য পায়ে শিকল পরিয়ে দেন পরিবারের সদস্যরা। সেই সাময়িক ব্যবস্থা ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে দীর্ঘ ১৫ বছরের বন্দিজীবনে।
মিতুর মা হাসিনা বেগমের কথায় ফুটে ওঠে অসহায়ত্বের চিত্র। তিনি বলেছেন, ‘মেয়েটি প্রায়ই এদিক-সেদিক চলে যায়, তাই বাধ্য হয়ে তাকে শিকলে বেঁধে রাখতে হয়েছে। অভাবের কারণে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারিনি।’ তার আশা, ভালো চিকিৎসা পেলে সে সুস্থ হতে পারে।
মিতুর বাবা আবুল মোড়ল মারা গেছেন প্রায় আট বছর আগে। এরপর থেকে মেয়ের দেখাশোনার পুরো দায়িত্বই মায়ের ওপর। বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট ভাই ঢাকায় একটি বেকারিতে কাজ করেন। মাসে তার আয় মাত্র ৮ হাজার টাকা। এই সামান্য আয় দিয়ে পরিবারের খরচ চালানোই কঠিন; সেখানে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করা পরিবারের পক্ষে প্রায় অসম্ভব।
অভাবের এই বাস্তবতাই মিতুর চিকিৎসার পথকে আরও কঠিন করে তুলেছে। ফলে সময়ের সঙ্গে তার পায়ের শিকল যেমন স্থায়ী হয়েছে, তেমনি স্থায়ী হয়েছে ঘরবন্দি জীবনও। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, এই অবস্থাকে চিরস্থায়ী বলে ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
তালা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. খালিদ হাসান নয়নের ভাষ্য, ‘সঠিক চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মিতুর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’
তার এই বক্তব্য মিতুর পরিবার ও স্থানীয় মানুষের মধ্যেও সঞ্চার করেছে নতুন আশা। বিষয়টি জানার পর সরকারি সহায়তার আশ্বাসও এসেছে। তালা উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা আরিফুজ্জামান বলেছেন, ‘সরকারি বিধি অনুযায়ী দেওয়া হবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা। বিষয়টি বিবেচনা করা হবে গুরুত্বসহকারে।’
স্থানীয় প্রশাসনও মিতুর দীর্ঘ বন্দিজীবনকে অমানবিক বলে মনে করছে। তালা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জান্নাতুল আফরোজ স্বর্ণা মনে করেন, মিতুকে বন্দিজীবন থেকে মুক্ত করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।






