প্রকল্পের পর প্রকল্প তবুও ঘুচছে না দুঃখ

ফাইল ছবি
একদিকে চলছে কোটি টাকা ব্যয়ে নদী পুনঃখনন, অন্যদিকে বর্ষার পানিতে ডুবে আছে ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ফসলের মাঠ। জলাবদ্ধতা নিরসনে বছরের পর বছর নেওয়া হয়েছে একের পর এক প্রকল্প, হয়েছে নদী-খাল খনন, বসানো হয়েছে পাম্প। তবু চলতি বর্ষায় আবারও পানিবন্দি যশোরের ভবদহের মানুষ। প্রকল্পের পর প্রকল্প চললেও কাটছে না ভবদহের দুঃখ।
ভবদহ অঞ্চল বলতে বোঝায় যশোর সদর উপজেলার আংশিক এলাকা, অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষকে। এ অঞ্চলের পানি মূলত নিষ্কাশিত হয় মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি নদনদী দিয়ে। দীর্ঘদিন পলি জমে নদীগুলোর নাব্য কমে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবে নামতে পারছে না পানি। ফলে সামান্য ভারী বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হচ্ছে জলাবদ্ধতার।
জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ চলছে ছয়টি নদী পুনঃখনন। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে প্রকল্পটির আওতায় পুনঃখনন করা হচ্ছে হরি, তেলিগাতী, হরিহর, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর প্রায় ৮১ কিলোমিটার অংশ।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী জানালেন, প্রকল্পের ৭৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ চলমান। যেখানে পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, সেখানে কাজ করা হচ্ছে। নদী খননের কাজ সম্পূর্ণ হলে পাঁচ থেকে সাত বছর জলাবদ্ধতা থাকবে না বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে কাজ চললেও চলতি বছরের বর্ষায় আবারও ভয়াবহ জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে ভবদহ। জুলাই মাসের বৃষ্টিতে প্লাবিত হয় অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরের শতাধিক গ্রাম। পানিতে ডুবে যায় বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাছের ঘের। টানা বৃষ্টিতে অনেক এলাকায় পুরোপুরি কাটেনি জলাবদ্ধতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও এর স্থায়ী সুফল পাচ্ছেন না তারা।
এদিকে আমডাঙ্গা খাল সংস্কারে প্রায় ৪৯ কোটি ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে আলাদা প্রকল্প নেওয়া হলেও দুই বছর পেরিয়ে গেলেও শুরু হয়নি কাজ।
জলাবদ্ধতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে কৃষিতে। চলতি বছরও ভবদহের নিম্নাঞ্চলের অনেক জমিতে সম্ভব হয়নি বোরো ধান চাষ করা। কৃষি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরে প্রায় ৭ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়নি। গত বছরও এই তিন উপজেলায় ৮ হাজার ২৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা সম্ভব হয়নি।
শুধু কৃষিই নয়, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় বাড়ছে সুপেয় পানির সংকট, গোখাদ্যের অভাব, যোগাযোগব্যবস্থার বিপর্যয় ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। অনেক পরিবারকে ঘর ও উঠানে জমে থাকা পানির সঙ্গে বসবাস করতে হচ্ছে বছরের পর বছর।
মনিরামপুর উপজেলার মনোহরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আক্তার ফারুক মিন্টুর দাবি, প্রতি বছর জলাবদ্ধতার পর ত্রাণ, পাম্প বসানো কিংবা জরুরি খননের মতো সাময়িক উদ্যোগ না নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এ বছরও পানিবন্দি মানুষ স্থায়ী সমাধান ও কার্যকর টিআরএমের দাবিতে আন্দোলন করেছেন— জানালেন তিনি।
পায়রা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান মো. ফিরোজ আলমের ভাষ্য, নদী, খাল ও বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ফিরিয়ে এনে সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে প্রতি বর্ষাতেই একই দুর্ভোগ ফিরে আসবে। তখন ‘ভবদহের দুঃখ’ শুধু একটি এলাকার নয়, প্রতিচ্ছবি হয়ে থাকবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘস্থায়ী দুর্ভোগের।
ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির সদস্য সচিব চৈতন্য কুমার পালের অভিযোগ, বছরের পর বছর জলাবদ্ধতা নিরসনের নামে একের পর এক প্রকল্প নেওয়া হলেও হয়নি স্থায়ী সমাধান। তার মতে, ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে টিআরএম চালুই কার্যকর সমাধান। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, শুধু নদী খনন কিংবা পাম্পের মাধ্যমে পানি সরিয়ে ভবদহের জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। নদীর নাব্য ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি প্রয়োজন টিআরএম বা জোয়ারাধার। পরিকল্পিতভাবে জোয়ারের পানি নির্দিষ্ট বিলে প্রবেশ করিয়ে পলি জমার মাধ্যমে বিলের উচ্চতা বাড়ানো গেলে তৈরি করা সম্ভব দীর্ঘমেয়াদে পানি নিষ্কাশনের পথ।





