গাজীপুর দাবড়াচ্ছে ৩ লাখ অবৈধ অটোরিকশা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
গাজীপুর মহানগরীতে যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হয়ে উঠেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। মহাসড়ক থেকে নগরীর অলিগলি পর্যন্ত অবাধে চলছে এসব যান। বাংলাদেশ ইলেকট্রিক ব্যাটারি অ্যান্ড মোটরচালিত অটোরিকশা অটোবাইক সার্ভিস লিমিটেডের হিসাবে গাজীপুর মহানগরীতে দেড় লাখের বেশি এবং জেলায় প্রায় এক লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। তবে জেলায় চলাচলকারী অটোরিকশার সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অদক্ষ চালক, বেপরোয়া গতি, উল্টো পথে চলাচল ও ফিটনেসহীনতার কারণে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। একই সঙ্গে তীব্র যানজটে দুর্ভোগে পড়ছেন লাখো মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, চান্দনা চৌরাস্তা, জয়দেবপুর, শিববাড়ী, টঙ্গী, বোর্ডবাজার, ভোগড়া বাইপাস, নাওজোড়, তেলীপাড়া, সালনা ও কোনাবাড়ীসহ ব্যস্ত এলাকাগুলোয় অটোরিকশার আধিক্য। সড়কের মাঝখানে যাত্রী ওঠানামা করাচ্ছেন অনেক চালক। আবার উল্টো পথে চলছেন কেউ কেউ। এতে ব্যাহত হচ্ছে যানবাহনের স্বাভাবিক গতি।
গাজীপুর শহরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে শিববাড়ী হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, হাসপাতাল, পুলিশ সুপারের কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরগুলোয় যেতে হয় রেলগেট এলাকা পার হয়ে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এ পথে লেগে থাকে অটোরিকশার জট। এতে ভোগান্তিতে পড়েন কর্মজীবী মানুষ, শিক্ষার্থী, আইনজীবী ও সাধারণ যাত্রীরা।
এদিকে আইন অনুযায়ী মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচলের সুযোগ না থাকলেও ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে নিয়মিত চলাচল করছে এসব যান। কখনো চলছে উল্টো পথেও। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কের পাশাপাশি নগরীর প্রধান সড়কগুলোতেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে অটোরিকশার সংখ্যা। পুলিশ মাঝেমধ্যে অভিযান চালালেও পরে আবারও সড়কে ফিরে আসে এসব যান।
গাজীপুরের একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবু বকর বলেছেন, ‘জেলা শহর থেকে শুরু করে ব্যস্ত সব সড়কেই অটোরিকশার কারণে চলাচল করা কঠিন হয়ে পড়েছে।’
তবে অটোরিকশাচালক শরিফুল ইসলাম বললেন, ‘এই গাড়ি চালিয়ে পাঁচজনের সংসার চালাই। অটোরিকশা বন্ধ না করে নিয়মের মধ্যে আনা উচিত। চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সের ব্যবস্থা করা দরকার।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, অনুমোদনহীনভাবে বিভিন্ন গ্যারেজ ও কারখানায় তৈরি হচ্ছে এসব অটোরিকশা। দক্ষতা ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় ফিটনেসহীন অবস্থায় সড়কে নামছে অনেক যানবাহন। গাজীপুরে কতগুলো অটোরিকশা তৈরি ও চলাচল করছে, তার নির্ভরযোগ্য হিসাবও নেই সংশ্লিষ্টদের কাছে।
বাংলাদেশ ইলেকট্রিক ব্যাটারি অ্যান্ড মোটরচালিত অটোরিকশা অটোবাইক সার্ভিস লিমিটেডের কেন্দ্রীয় পরিচালক মজিবুর রহমান রানা জানিয়েছেন, তাদের হিসাবে গাজীপুর মহানগরীতে দেড় লাখের বেশি এবং জেলায় প্রায় এক লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। তবে সঠিক সংখ্যা তাদেরও জানা নেই। তিনি জানালেন, এসব যানকে নীতিমালার আওতায় আনার উদ্যোগ চলছে। চালকদের প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স, যানবাহনে চেসিস নাম্বার ও নাম্বারপ্লেট এবং এলাকাভিত্তিক চলাচলের সীমা নির্ধারণ করা হলে শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। তবে মহাসড়কে এসব যান চলাচল নিষিদ্ধ।
এদিকে অটোরিকশা চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে। এসব যানবাহনে নাম্বারপ্লেট বা চেসিস নাম্বার না থাকায় চুরি হওয়ার পর শনাক্ত ও উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। বাসন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হারুন অর রশিদ বলেছেন, ‘অটোরিকশা চুরি হলে উদ্ধার করা কঠিন। কারণ অনেক গাড়িতে নাম্বারপ্লেট, চেসিস নাম্বার বা শনাক্ত করার ব্যবস্থা নেই। চোররা গাড়ি খুলে ব্যাটারি, চাকা ও বিভিন্ন যন্ত্রাংশ আলাদা বিক্রি করে দেয়।’
গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, ‘মহাসড়কে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে। প্রতিদিনই বিভিন্ন স্থান থেকে অটোরিকশা ডাম্পিং করা হচ্ছে।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা মনে করেন, এসব যানকে একটি নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন। পাশাপাশি চালকদেরও আইন মেনে চলতে হবে।
গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শওকত হোসেন সরকার জানিয়েছেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার বিষয়ে সরকার একটি নীতিমালা করার উদ্যোগ নিয়েছে। পরিবেশবান্ধব যানবাহন, চালকদের দক্ষতা ও সড়কে শৃঙ্খলা নিশ্চিত করা গেলে সমস্যার সমাধান সম্ভব হবে।






