অসহায়ের মুখে হাসি ফোটাচ্ছেন মামুন বিশ্বাস

সংগৃহীত ছবি
সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার আগনুকালী গ্রামের যুবক মামুন বিশ্বাস এখন অবহেলিত মানুষ ও বন্য প্রাণীর পরম বন্ধুতে পরিণত হয়েছেন। 'মানবতার ফেরিওয়ালা' হিসেবে পরিচিত এই তরুণ ২০১৩ সাল থেকে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন অসহায়দের মুখে হাসি ফোটাতে। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষের পুনর্বাসন থেকে শুরু করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের সহায়তা, গৃহহীনদের ঘর নির্মাণ কিংবা অসুস্থদের চিকিৎসার ব্যবস্থা—সমাজসেবার প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই তার পদচারণা আজ দৃশ্যমান। ফেসবুকের বিশাল ফলোয়ার সংখ্যাকে কাজে লাগিয়ে দেশ-বিদেশের মানুষের আর্থিক সহায়তায় তিনি গড়ে তুলছেন অসংখ্য মানুষের নতুন জীবন।
মামুন বিশ্বাসের মানবিক কাজের অন্যতম একটি দৃষ্টান্ত যমুনার চরাঞ্চলের বাসিন্দা তৃতীয় লিঙ্গের মেহেরুন। নিজের পরিবার ও সমাজ থেকে বিতাড়িত হয়ে অতিকষ্টে দিনাতিপাত করা মেহেরুন আজ একজন সফল মা ও পরিশ্রমী মানুষ। মামুনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ফেসবুক বন্ধুদের সহযোগিতায় মেহেরুন পেয়েছেন একটি রঙিন টিনের ঘর, তিনটি ছাগল, আসবাবপত্র এবং নিজের পালিত মেয়ের পড়াশোনার সব খরচ। শুধু মেহেরুনই নন, সিরাজগঞ্জের যেকোনো সংকট বা বন্য প্রাণীর বিপদ দেখলেই মানুষ এখন মামুন বিশ্বাসকে স্মরণ করেন। বন্য প্রাণী সংরক্ষণে তার গড়া প্রতিষ্ঠান 'দ্য বার্ড সেফটি হাউস' এলাকায় ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছে।
নিজের এই সংগ্রাম ও কাজের পেছনের গল্প তুলে ধরে মামুন বিশ্বাস মন্তব্য করেন, তার জীবনের শুরুটা হয়েছিল বেদনার মধ্য দিয়ে। তিনি বললেন, প্রতিবন্ধীদের যে কী কষ্ট, তা আমি নিজের প্রতিবন্ধী বোনকে দেখে বুঝতে পারি। এ ছাড়াও জন্মের ৩৮ ঘণ্টার মাথায় আমার নবজাতক ছেলে মারা যায়। সন্তানকে বাঁচাতে চারটি হাসপাতালে ঘুরেও বিফল হয়ে আমি বুঝি যে টাকাই জীবনের সব নয়। সন্তান হারানোর সেই কষ্টই আমাকে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মনোবল ও বন্য প্রাণী নিয়ে কাজ করার শক্তি জুগিয়েছে।
শাহজাদপুর উপজেলার এই যুবকের বাবা অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক এবং বড় ভাই ব্যবসায়ী। ভাইয়ের ব্যবসায় সহযোগিতা করার পাশাপাশি তিনি মানুষের সেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছেন।
শুরুতে প্রতিকূলতার কথা স্মরণ করে মামুন বিশ্বাসের ভাষ্য, আমি যখন এই কাজ শুরু করি তখন আমাকে সবাই পাগল বলত। তবে আমার বাবা আলহাজ ডা. মো. মাহবুবুল হোসেন জোস্না ও বড় ভাই মুক্তা বিশ্বাস আমাকে সব সময় সাপোর্ট ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। বাবা বলতেন, তুমি তোমার কাজ করো, মানুষ তোমাকে কী বলল সেটা বড় কথা নয়; তুমি তোমার কাজকে শ্রদ্ধা করো।
কাজের সফলতার কথা বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচার হওয়ার পর এখন এলাকার মানুষও তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করছেন। তবে বন্য প্রাণী উদ্ধারের সময় অনেক ক্ষেত্রে গ্রামবাসীকে আইন বোঝাতে গিয়ে তাকে বেশ বেগ পেতে হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান 'ইত্যাদি' ২০১৬ সালে তার কাজ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রচার করলে দেশ-বিদেশে ব্যাপক সাড়া পড়ে। মামুন বিশ্বাস দাবি করেন, তার এই কাজের সব কৃতিত্ব ফেসবুক বন্ধুদের। তিনি জানান, আমার প্রতিটি পোস্টে কাজের ও টাকার পাই টু পাই হিসাব দেওয়া হয়। যারা যেকোনো মানবিক আবেদনে সাড়া দিয়ে অর্থ পাঠান। মানুষের সমস্যার কথা জানলে তিনি সরেজমিনে গিয়ে যাচাই করেন এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় বিস্তারিত তুলে ধরেন। কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ইতিমধ্যে 'করোনা বীরযোদ্ধা' খেতাবসহ বিভিন্ন সংগঠন থেকে অসংখ্য সম্মাননা লাভ করেছেন।
সিরাজগঞ্জের বিশিষ্টজনদের মতে, মামুন বিশ্বাস শুধু ওই অঞ্চলের নয়, বরং দেশের সম্পদ। তিনি যদি দেশের প্রতিটি প্রান্তে থাকতেন, তবে কোনো অসহায় মেয়েকে বিয়ের জন্য চিন্তা করতে হতো না কিংবা কোনো অসুস্থ মানুষকে রাস্তায় পড়ে ধুঁকতে হতো না। মামুন বিশ্বাস স্বপ্ন দেখেন, একদিন বাংলাদেশের প্রতিটি ইউনিয়নে তরুণ প্রজন্ম একযোগে কাজ করবে এবং কেউ অর্থের অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করবে না।
সব বাধা পেরিয়ে মানুষের জন্য নিবেদিত এই প্রাণ জানালেন, দিনশেষে একজন অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারা কিংবা একটি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে মুক্ত আকাশে ওড়ানোই তাকে বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা দেয়।




