বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
যাদের উদ্ভাবনে বদলে গেছে খাদ্য মানচিত্র

ছবি : ইসতিয়াক রেজা নূর
ছোট্ট একটি দেশ বাংলাদেশ। আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যা বিপুল। মানুষের সংখ্যা বাড়ছে; কিন্তু বাড়ছে না আবাদি জমি। বরং নগরায়ণের বিস্তারে প্রতি বছরই কমছে কৃষিজমির পরিমাণ। এর মধ্যেও সারা বছর বাজারে মিলছে নানা ধরনের শাকসবজি। নদী-নালার প্রাকৃতিক উৎস থেকে মাছের উৎপাদন
আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেলেও সে ঘাটতি পূরণ করছে ব্যক্তি উদ্যোগে গড়ে ওঠা পুকুর ও খামারের মাছ চাষ। ছোট-বড় খামারে বাড়ছে দুধ, মাংস ও ডিমের উৎপাদন। পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার এখন মানুষের নাগালের মধ্যেই। শুধু দেশের চাহিদা মেটানো নয়; বাংলাদেশের বিভিন্ন কৃষিপণ্য এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে।
খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার এ পরিবর্তনে যেসব প্রতিষ্ঠান নেপথ্যে কাজ করে চলেছে, তাদের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বাকৃবি)। ময়মনসিংহ নগরীর উত্তর-পূর্ব প্রান্তে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে প্রায় ১ হাজার ২০০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠা এই বিশ্ববিদ্যালয় ৬৬ বছর ধরে কৃষি, মৎস্য, প্রাণিসম্পদসহ কৃষির নানা ক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশের উৎপাদন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
হাঁটি হাঁটি পা পা করে ৬৬ বছরে পা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ সময়ের মধ্যে এখান থেকে প্রায় ৬০ হাজার শিক্ষার্থী স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেছেন। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে থাকা এসব গ্র্যাজুয়েট কৃষি, প্রাণিসম্পদ, মৎস্য, গবেষণা, প্রশাসন ও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অবদান রেখে চলেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশে আরও নয়টি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। কৃষিবিষয়ক গবেষণা ও সম্প্রসারণে কাজ করছে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও অধিদপ্তর। এসব ক্ষেত্রেও বাকৃবির গ্র্যাজুয়েটদের রয়েছে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি।
দুই অনুষদ থেকে ছয় অনুষদের বিশাল পরিসর: ১৯৬১ সালের ১৮ আগস্ট ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রা শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠার সময় ছিল দুটি অনুষদ— ভেটেরিনারি ও কৃষি। কয়েক মাসের মধ্যেই চালু হয় পশুপালন অনুষদ। এরপর সময়ের সঙ্গে একে একে যুক্ত হয়েছে অন্যান্য অনুষদ ও বিভাগ।
প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকেই বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় বিশ্ববিদ্যালয়টি। ইরান, ইরাক, নাইজেরিয়া, সুদান, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে পড়তে আসতেন। তখন প্রতি বছর ভর্তি করা হতো প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী। সময়ের সঙ্গে সে সংখ্যা বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ হাজারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেড়েছে নারীর সংখ্যাও। বর্তমানে ছেলেমেয়েদের জন্য রয়েছে মোট ১৫টি আবাসিক হল। সব মিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে গড়ে প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
বর্তমানে বাকৃবিতে রয়েছে ছয়টি অনুষদ, ৪৩টি বিভাগ ও ছয়টি ইনস্টিটিউট। স্নাতক পর্যায়ে নয়টি এবং স্নাতকোত্তর পর্যায়ে প্রায় ৫০টি ডিগ্রি দেওয়া হচ্ছে। শিক্ষক রয়েছেন প্রায় ৬০০ জন। কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ২০০ জন।
গবেষণায় আলাদা নজর: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমকে আরও সংগঠিত ও কার্যকর করতে ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রিসার্চ সিস্টেম— বাউরেস। প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাউরেসের তত্ত্বাবধানে প্রায় সাড়ে চার হাজার গবেষণা প্রকল্পের কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
গবেষণায় উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ও জ্ঞান মাঠপর্যায়ে কৃষকের কাছে পৌঁছে দিতে ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রসারণ কেন্দ্র (বাউএক)। গবেষণাগারের উদ্ভাবন যেন মাঠে গিয়ে কৃষকের উৎপাদন বাড়াতে কাজে লাগে, সে সেতুবন্ধ তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি কাজ করে আসছে।
ধান, সরিষা, ডাল, শাকসবজি, মাছ, গবাদি পশু— কৃষির প্রায় প্রতিটি খাতেই গবেষণা হয়েছে বাকৃবিতে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গবেষকরা নিয়ে এসেছেন উন্নত থেকে উন্নততর প্রযুক্তি ও উৎপাদন পদ্ধতি।
ফসলের নতুন জাত থেকে কৃষি প্রযুক্তি: বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উদ্ভাবনের তালিকায় রয়েছে বিভিন্ন ফসল ও কৃষিপণ্যের উন্নত জাত। পাঙাশ থেকে তৈরি হয়েছে ১১ ধরনের পণ্য। সরিষার উদ্ভাবন করা হয়েছে আটটি উচ্চ ফলনশীল, লবণসহিষ্ণু ও স্বল্প সময়ে উৎপাদনযোগ্য জাত। মিষ্টি আলুর ছয়টি জাত, উফশী ধানের বাউ-৬৩ ও বাউধান-২, বাউকুল, আলুর কমলা সুন্দরী ও তৃপ্তি এবং মুখীকচুর লতিরাজ, বিলাসী, দৌলতপুরী জাতসহ বিভিন্ন ফসলের জাত উদ্ভাবন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা।
সাম্প্রতিক গবেষণায়ও এসেছে নানা নতুন সম্ভাবনা। ২৫টির বেশি বিপজ্জনক বালাইনাশক শনাক্ত করা, চালে আর্সেনিকের মাত্রা কমাতে সেচপদ্ধতি উদ্ভাবন, নারকেলগাছে সাদা মাছির নতুন প্রজাতি শনাক্ত এবং আমের বীজের নির্যাসে ব্যাকটেরিয়াবিরোধী গুণাগুণ আবিষ্কারের মতো গবেষণা হয়েছে এখানে।
সমুদ্রের শৈবাল থেকে সাবান ও ক্যান্ডি তৈরি, ব্রয়লারের হিট স্ট্রেস কমাতে আমলকীর ব্যবহার, মাছের ত্বক থেকে জেলাটিন তৈরি, অপ্রচলিত রোজেল থেকে খাদ্যপণ্য তৈরি, গবাদি পশুর হিট স্ট্রেস নিয়ন্ত্রণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি এবং সমুদ্রে ভাসমান খাঁচায় কৃত্রিম খাদ্য ব্যবহার করে ভেটকি চাষ— এমন নানা গবেষণায়ও সাফল্য পেয়েছেন বাকৃবির গবেষকরা।
কৃষকের কাজ সহজ করতে উদ্ভাবন করা হয়েছে সয়েল টেস্টিং কিট, সোলার ড্রায়ার, বাউ-এসটিআর ড্রায়ার, উন্নত লাঙল ও স্প্রে মেশিন। রয়েছে আইপিএম ল্যাব, বায়োপেস্টিসাইড, দেশি খেজুর থেকে ভিনেগার তৈরির প্রযুক্তি, কলা-আনারস উৎপাদনের উন্নত প্রযুক্তি এবং জ্বালানিসাশ্রয়ী চুলাসহ নানা কৃষি যন্ত্রপাতি।
প্রাণিসম্পদেও বড় ভূমিকা: কৃষির পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ খাতেও বাকৃবির গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিস্তর পরিধি রয়েছে। গরু ও ছাগলের মাংসে যক্ষ্মার জীবাণু শনাক্তকরণ, ব্রুসেলোসিসের হিট ফিল্ড ভ্যাকসিন, মোরগ-মুরগির রানীক্ষেত ও ফাউলপক্সের প্রতিরোধক টিকা, হাঁসের প্লেগ ভ্যাকসিন এবং হাঁস-মুরগির ফাউল কলেরার ভ্যাকসিন উদ্ভাবন ও রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছেন গবেষকরা।
গবাদি পশুর ভ্রূণ প্রতিস্থাপন, ছাগল ও মহিষের কৃত্রিম প্রজনন, কৃত্রিম প্রজননে ব্যবহৃত ষাঁড়ের আগাম ফার্টিলিটি নির্ণয়, গাভীর ওলানফোলা রোগপ্রতিরোধ, হরমোন পরীক্ষার মাধ্যমে গরু ও মহিষের গর্ভ নির্ণয়, উন্নত জাতের হাঁস-মুরগি উদ্ভাবন এবং সুষম পোলট্রি খাদ্য তৈরির প্রযুক্তিও এসেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা থেকে।
মাছ উৎপাদনে নতুন দিগন্ত: বাংলাদেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তায় মৎস্য খাতের অবদানও দিন দিন বাড়ছে। আর এ খাতের উন্নয়নেও দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে বাকৃবি।
মাগুর ও শিং মাছের কৃত্রিম প্রজননের কলাকৌশল, শিং মাছের জিনোম সিকোয়েন্স উন্মোচন, ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ, খাঁচায় পাঙাশ চাষ, পেরিফাইটনভিত্তিক মৎস্য চাষ, দেশি পাঙাশের কৃত্রিম প্রজনন এবং ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মৎস্য চাষের মতো প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসেবে টিউবিফিসিড উৎপাদন, পুকুরে মাগুর চাষের উপযোগী সহজলভ্য খাদ্য তৈরি, মাছের রোগপ্রতিরোধে ঔষধি গাছের ব্যবহার এবং মলিকুলার পদ্ধতিতে মাছের বংশপরিক্রম নির্ণয়েও সাফল্য এসেছে।
তারাবাইম, গুচিবাইম ও বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজনন, ধানক্ষেতে মাছ ও চিংড়ি চাষ, সহজলভ্য মাছের খাদ্য তৈরি এবং অ্যাকোয়াপনিকসের মাধ্যমে একই সঙ্গে মাছ ও সবজি উৎপাদনের মতো প্রযুক্তিও যুক্ত হয়েছে এ তালিকায়।
প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ব্যক্তি উদ্যোগে মাছ চাষের যে বিস্তার বাংলাদেশে ঘটেছে, তার পেছনে এ ধরনের গবেষণা ও প্রযুক্তির অবদানও কম নয়।
গবেষণাগার থেকে মাঠে, মাঠ থেকে মানুষের ঘরে: বাংলাদেশের কৃষি আজ যে বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে, তার পেছনে রয়েছে কৃষক, উদ্যোক্তা, গবেষক ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত চেষ্টা। সেই দীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও বিস্তৃত। নতুন জাত উদ্ভাবন থেকে শুরু করে রোগ নির্ণয়, টিকা, কৃত্রিম প্রজনন, মাছ চাষ, কৃষিযন্ত্র, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং জলবায়ু মোকাবিলায় প্রযুক্তি— কৃষির প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণার ছাপ রেখেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. রফিকুল ইসলাম সরদার বলেছেন, ‘দেশের মানুষকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার পেছনে বাকৃবির অবদান অপরিসীম। আধুনিক কৃষির রূপান্তর, জলবায়ু সহনশীল কৃষি এবং প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন বৃদ্ধিতে বাকৃবি আজও অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।’
৬৬ বছরের পথচলায় তাই বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; দেশের কৃষির পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা একটি দীর্ঘ গবেষণা-অভিযানের নাম। যে অভিযানের সুফল কখনো নতুন ধানের শিষে, কখনো পুকুরভরা মাছে, কখনো খামারের দুধ-মাংস-ডিমে, আবার কখনো কৃষকের হাতে পৌঁছে যাওয়া নতুন প্রযুক্তিতে— নানা রূপে ছড়িয়ে পড়ছে দেশের মানুষের খাদ্য ও পুষ্টির নিরাপত্তায়।



