যেখানে বিপদ কল্পকাহিনি নয়

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রাস্তার দুই পাশে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে বহুতল। নিচে মানুষের ভিড়, যানবাহনের চাপ, কোলাহল। প্রথম দেখায় সবকিছুই লাগে স্বাভাবিক। একটু খেয়াল করলেই চোখে পড়ে অন্য বাস্তবতা। কোথাও ভবনের গা ঘেঁষে আরেকটি ভবন। কোথাও নেই খোলা জায়গা। কোথাও আবার এতটাই সরু পথ ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢোকানোই কঠিন। রাজশাহী শহরের বাসিন্দাদের অজান্তে এভাবেই তৈরি হচ্ছে একেকটি সম্ভাব্য বিপর্যয় কেন্দ্র।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এই বিপদ কোনো কল্পকাহিনি নয়।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিসের হিসাব বলছে, নগরীর অন্তত ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। আর রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) তথ্য অনুযায়ী, জেলার ১ হাজার ২৪৫টি বহুতলের মধ্যে ৮৪৮টিই হয়েছে প্রয়োজনীয় রাস্তার জায়গা না রেখে কিংবা নির্মাণবিধি লঙ্ঘন করে। সংখ্যাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়; এর ভেতরে লুকিয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্ন।
একসময় দেশের পরিকল্পিত ও পরিচ্ছন্ন শহর হিসেবে পরিচিত ছিল রাজশাহী। প্রশস্ত সড়ক, খোলামেলা পরিবেশ এবং সুশৃঙ্খল আবাসিক এলাকার জন্য সুনাম ছিল; কিন্তু গত দুই দশকে সেই চিত্রে এসেছে পরিবর্তন। বাড়তি জনসংখ্যা, আবাসন চাহিদা এবং বাণিজ্যিক সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে শহরের আকাশে মাথা তুলেছে অসংখ্য বহুতল। উন্নয়নের এই দৃশ্যমান চিত্রের আড়ালে জমেছে নতুন উদ্বেগ।
দুই দশক আগে জীবন বীমা করপোরেশনের ১০ তলা ভবনটিই ছিল শহরের সবচেয়ে উঁচু ভবন। এখন বিভিন্ন এলাকায় ৮, ১০, ১২ তলা কিংবা তার চেয়েও উঁচু ভবন; কিন্তু এসব ভবনের বড় অংশ হয়েছে নিয়মকানুন ও নিরাপত্তা মানদণ্ড উপেক্ষা করে। আরডিএর তথ্য, বহুতলের প্রায় ৬৮ শতাংশই রাস্তার জায়গা না রেখে হয়েছে। ফলে জরুরি পরিস্থিতিতে এসব এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা করা চ্যালেঞ্জ হবে।
নগরীর উপশহর, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, ভদ্রা, কাদিরগঞ্জ ও শিরোইল এলাকা ঘুরে দেখা যায়, অনেক ভবন রাস্তার একেবারে গা ঘেঁষে। কোথাও পাশাপাশি দুটি ভবনের মধ্যকার দূরত্ব এতটাই কম সূর্যের আলোও প্রবেশ করতে পারে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, এসব অনিয়ম শুধু সৌন্দর্যহানি নয়, বরং জননিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি।
নগরীর উপশহর নিউ মার্কেট মোড়ের একটি ৯ তলা ভবন আলোচিত উদাহরণ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবনটি করে ফ্ল্যাট বিক্রি করা হয়। পরে আরডিএ জানতে পারে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ছাড়াই হয়েছে ভবনটি। এ ঘটনায় মামলা করা হয়েছে। একই ধরনের অভিযোগ সাহেববাজার এলাকার ১২ তলা এসএস টাওয়ারের বিরুদ্ধেও।
যদিও অনেক ভবন মালিকই সাত তলার অনুমোদন নিয়ে পরে অতিরিক্ত দুই বা তিন তলা করেছেন। এসব কারণে ভবনগুলো শুধু নিয়মবহির্ভূতই নয়, সম্ভাব্য দুর্ঘটনার ক্ষেত্রেও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাজশাহী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাক বললেন, ‘বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মার্কেটসহ নগরীর ৭২১টি ভবন বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। অনেক ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। কোথাও জরুরি নির্গমন পথ সংকুচিত, কোথাও আবার অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রপাতি অপ্রতুল। নিয়ম না মেনে ভবন নির্মাণের কারণে ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনা বা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আবু খায়ের চাঁনমিয়ার ভাষ্য, ‘চারদিকে যেভাবে ভবন হচ্ছে, তাতে বড় আগুন লাগলে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ভেতরে ঢুকতে পারবে কি না সন্দেহ আছে। ভূমিকম্প হলে তো আরও বড় বিপদ।’
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ঝুঁকি শুধু অগ্নিকাণ্ডের নয়, ভূমিকম্পেরও। নির্মাণবিধি না মেনে তৈরি ভবন বড় কম্পনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। অতিরিক্ত তলা সংযোজন, নকশা বহির্ভূত নির্মাণ এবং কাঠামোগত ত্রুটি থাকলে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা বাড়তে পারে বহুগুণ।
রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (রুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল ওয়াকিল আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘শুধু নোটিস বা মামলা করেই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। নিয়মবহির্ভূতভাবে নির্মিত ভবনের অবৈধ অংশ ভেঙে দিতে হবে। আরডিএকে মাঠপর্যায়ে কঠোর হতে হবে এবং মোবাইল কোর্ট পরিচালনা জোরদার করতে হবে। অন্যথায় এই অনিয়ম কোনোভাবেই বন্ধ হবে না।’
তার মতে, পরিকল্পিত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে নিয়মিত তদারকি জরুরি।
অন্যদিকে নগরবাসীর একটি অংশের অভিযোগ, কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী মহলের যোগসাজশে নিয়মবহির্ভূত ভবন নির্মাণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে আরডিএ।
আরডিএর ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল তারিক জানালেন, গত পাঁচ বছরে দেড় শতাধিক ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ১৪০টি ভবনের বর্ধিত ও অবৈধ অংশ অপসারণ করা হয়েছে। নিয়ম লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত। ভবিষ্যতেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আরডিএর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মশিউর রহমান বললেন, ‘অনুমোদনহীন ভবনের মালিকদের বিরুদ্ধে নোটিস ও মামলা করার প্রক্রিয়ায় কিছুটা সময় লাগে। বর্তমানে কোনো কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে প্ল্যান পাস করানোর সুযোগ নেই।’
আরডিএ সূত্র বলছে, গত এক দশকে অবৈধভাবে ভবন নির্মাণের অভিযোগে সাড়ে ছয় হাজারের বেশি ভবন মালিককে নোটিস দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে নির্মাণসংক্রান্ত ১৪টি মামলা বিচারাধীন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়— এত নোটিস, মামলা ও অভিযানের পরও কেন শত শত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এখনো নগরীর বুকে দাঁড়িয়ে? পরিকল্পিত নগরায়ণের পথে যেতে শুধু ভবনের সংখ্যা বাড়ালেই হবে না, নিশ্চিত করতে হবে নিরাপত্তা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ। তা না হলে আজকের এই পরিসংখ্যান যে বিপদ ডেকে আনবে তা কোনো কল্পকাহিনি হবে না। ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডির প্রতীকে পরিণত হবে।





