অবিভক্ত বাংলার পঞ্চম গির্জা এখন নবাবগঞ্জের প্রধান আকর্ষণ

ছবি: আগামীর সময়
ঢাকার নবাবগঞ্জ উপজেলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে অবিভক্ত বাংলার পঞ্চম প্রাচীনতম উপাসনালয় ‘রানীর পবিত্র জপমালা গির্জা’। ১৭৭৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই গির্জাটি বর্তমানে এ অঞ্চলের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রধান উপাসনালয় ও পর্যটকদের কাছে অন্যতম দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ১৭৭০ থেকে ১৭৭৬ সালের দিকে পদ্মার ভাঙনসহ বিভিন্ন কারণে দোহারের মালিকান্দা থেকে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের লোকজন নবাবগঞ্জের হাসনাবাদ গ্রামে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরে ফাদার রাফায়েল গমেজ এই অঞ্চলে প্রথম গির্জাটি নির্মাণ করেন। আদিতে এটি কাঁচা ভবন থাকলেও ১৮৮৮ সালে প্রথম সংস্কারের মাধ্যমে একে পাকা রূপ দেওয়া হয় এবং পরবর্তী সময়ে ২০০২ সালে এটি আবার আধুনিকায়ন করা হয়। দৃষ্টিনন্দন এই গির্জাটি ছাড়াও বর্তমানে নবাবগঞ্জে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের উপাসনার জন্য আরও চারটি চমৎকার গির্জা রয়েছে।
হাসনাবাদ সেন্ট ইউফ্রেজিস স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ সিস্টার মার্গ্রেট এই জনপদের অসাম্প্রদায়িক পরিবেশের প্রশংসা করে বললেন, নবাবগঞ্জ একটি সম্প্রীতির এলাকা, যেখানে সব ধর্মের মানুষ অত্যন্ত শান্তিতে বসবাস করছে এবং একে অপরের ধর্মীয় উৎসবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সহযোগিতা করে।
হাসনাবাদের এই প্রধান গির্জার পাশাপাশি উপজেলার অন্যান্য স্থানেও ছড়িয়ে রয়েছে ঐতিহাসিক আরও কয়েকটি উপাসনালয়। এর মধ্যে ১৮৪৪ সালে পুরাতন বান্দুরায় নির্মিত হয় একটি গির্জা, যা কয়েক দফায় সংস্কার ও স্থান পরিবর্তনের পর ১৯৬৫ সালে ‘সাধু ফ্রান্সিস জোভিয়ারের গির্জা’ বা গোল্লা গির্জা নামে পরিচিতি পায়। এ ছাড়া ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় তুইতাল ধর্মপল্লী, যেখানে ১৯৯৩ সালে জরাজীর্ণ ভবন ভেঙে বর্তমানে ‘পবিত্র আত্মার গির্জা’ নির্মাণ করা হয়েছে। গোল্লা ধর্মপল্লীর অধীনে ১৮৯৪ সালে নির্মিত পাদুয়ার সাধু আন্তনীর গির্জাটি বর্তমানে বিদ্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং তার পাশেই ২০০৫ সালে নতুন একটি মনোরম গির্জা ভবন তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে ১৯৪৫ সালে তুইতাল ধর্মপল্লীর অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ফাতেমা রানীর গির্জা’, যার প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পাখি ডাকা নিরিবিলি আবহাওয়া যে কাউকে মুগ্ধ করে। এ ছাড়াও ২০০৩ সালে দোহারের একমাত্র গির্জা হিসেবে ইকরাশিতে নির্মিত হয় ‘সাধু যোসেফ চ্যাপেল’।
উপজেলার সবচেয়ে বড় এবং প্রাচীন এই গির্জাগুলোতে, বিশেষ করে বড়দিন বা স্টার সানডেতে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়ে। হাসনাবাদ ধর্মপল্লীর বর্তমান ধর্মযাজক ফাদার অমল ধর্মীয় গুরুত্বের কথা তুলে ধরে জানালেন, পবিত্র এই গির্জায় প্রতিদিন ধর্মপ্রাণ মানুষের ভিড় থাকে, তবে রবিবার বিশেষ প্রার্থনার দিনে জনসমাগম বহুগুণ বেড়ে যায়।
তিনি আরও জানান, ধর্মীয় আচার পালনের পাশাপাশি এই ঐতিহাসিক স্থাপনা এক নজর দেখতে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে প্রচুর পর্যটক ও ভ্রমণপিপাসু মানুষ ভিড় করেন। চারশ বছরের পুরনো ভাঙা মসজিদ এবং দুই শতাধিক মন্দিরের পাশাপাশি এই পাঁচটি গির্জা নবাবগঞ্জের অসাম্প্রদায়িক পরিচয়কে বিশ্বের কাছে উজ্জ্বল করে রেখেছে।
চমৎকার কবরস্থান ও বিশাল খেলার মাঠবেষ্টিত হাসনাবাদ গির্জাটি বর্তমানে নবাবগঞ্জের ইতিহাসের এক জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।




