নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে চলছে ইলিশ শিকার, গোপনে চলছে বেচাকেনা

ইলিশ শিকার করছেন জেলেরা
পটুয়াখালীর গলাচিপায় মা ইলিশ রক্ষায় সরকারি নিষেধাজ্ঞা চললেও থামছে না ইলিশ শিকার ও গোপনে বেচাকেনা। রাতের আঁধারে নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরা হচ্ছে। দিনের আলোতেও চলছে ইলিশ শিকার। আবার নির্দিষ্ট ক্রেতার ফোন পেয়ে ব্যাগে করে মাছ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অপরিচিত কেউ ইলিশ কিনতে চাইলে আগে তার নাম-পরিচয় নিশ্চিত করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও সরাসরি মাছ না দিয়ে নির্ধারিত স্থানে টাকা রেখে যাওয়ার কথাও বলা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও দালালচক্রের সহযোগিতায় এসব অবৈধ কারবার চলছে। উপজেলার অন্তত ১০ থেকে ১৫টি স্থানে দালাল ও নির্ধারিত ক্রেতাদের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞার মধ্যে ধরা ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে।
গত তিন দিন গলাচিপার বিভিন্ন চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী এলাকা ঘুরে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মোবাইলে যোগাযোগ করলেই ইলিশ পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে অপরিচিত ক্রেতার কাছে সহজে মাছ বিক্রি করা হয় না। আগে ক্রেতার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। এরপর ঠিক করা হয় মাছ সরবরাহের স্থান ও পদ্ধতি। নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে অর্ডার দিলে ব্যাগে করে মাছ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে বলে অভিযোগ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা জানান, এসব কারবারের সঙ্গে জড়িত চক্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস পান না অনেকে। তাদের দাবি, মাছ ধরতে যাওয়ার সময় কিংবা মাছ নিয়ে ফেরার পথে মোবাইলের ক্যামেরা ব্যবহারেও নিষেধ করা হয়। যাতে ভিডিও ধারণ বা তাৎক্ষণিক যোগাযোগের মাধ্যমে তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা না থাকে, সে জন্যই এমন সতর্কতা।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, চরকাজল ইউনিয়নের লঞ্চঘাট, চরশিবা লঞ্চঘাট ও বড় শিবা; চরবিশ্বাস ইউনিয়নের চরআগস্তি, জিমতলা, নোমোর স্লুইসগেট, আমড়াগাছিয়া, চরবাংলা খেয়াঘাট ও চরবাংলা; রতনদী তালতলী ইউনিয়নের বন্যাতলী ও পাতাবুনিয়া স্লুইসগেট এবং সদর ইউনিয়নের চরকারফারমা এলাকায় ইলিশ ধরা ও বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া পানপট্টি লঞ্চঘাট, বটতলা বাজার, বোয়ালিয়া স্লুইসগেট, পক্ষিয়া স্লুইসগেট, লোন্দা স্লুইসগেট ও গলাচিপা-পাটুয়া খেয়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানেও অবৈধভাবে ইলিশ কেনাবেচা হচ্ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
গলাচিপা পৌর এলাকার কাছের রামনাবাদ নদী, চিকনিকান্দির দয়াময়ী মন্দিরসংলগ্ন তেঁতুলিয়া নদীর পয়েন্ট, বন্যাতলীর তেঁতুলিয়া নদীর পয়েন্ট এবং পানপট্টি লঞ্চঘাটসংলগ্ন এলাকা ও বটতলা বাজারের কাছে আগুনমুখা নদীর মোহনায় রাতের আঁধারে জাল ফেলার অভিযোগও করেছেন তাঁরা।
স্থানীয়দের দাবি, দুপুরের পর নদীর পাড়ে গেলে ছোট ছোট নৌকায় তিন থেকে চারজনকে ইলিশ শিকার করতে দেখা যায়। নদীর পাড়ের বিভিন্ন স্থানে জেলেদের সহযোগীরা অবস্থান করেন। প্রশাসনের টহল ট্রলার দেখামাত্র তারা জেলেদের কাছে খবর পৌঁছে দেন। এরপর উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দ্রুত তীরে ফিরে ধানখেত কিংবা বনের ভেতর লুকিয়ে পড়েন জেলেরা। কেউ কেউ বন বিভাগের সংরক্ষিত বনে আশ্রয় নিয়ে আত্মগোপন করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
মা ইলিশ রক্ষায় অভিযান চালাতে গিয়ে প্রশাসনকেও বাধার মুখে পড়তে হচ্ছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে চরবিশ্বাস ইউনিয়নের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র প্রশাসনের ট্রলারের দিকে তেড়ে আসে, ইটপাটকেল ছোড়ে এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করে পরিস্থিতি উত্তপ্ত করার চেষ্টা করে বলে জানিয়েছেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা।
অভিযোগ রয়েছে, একদিকে প্রশাসনের অভিযান চলছে, অন্যদিকে আশপাশের নদীতে জাল ফেলে মাছ ধরার তৎপরতাও অব্যাহত রয়েছে। এতে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হচ্ছে। অভিযানের খবর সংশ্লিষ্ট চক্র আগেভাগে পেয়ে যাচ্ছে কি না, কিংবা দুর্গম চরাঞ্চলে নজরদারি আরও জোরদার করা প্রয়োজন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এসব অভিযোগ যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞার প্রথম ১২ দিনে ৩৮টি অভিযান ও চারটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। এ সময়ে ইলিশ ও জাল জব্দের পাশাপাশি মামলা, কারাদণ্ড ও জরিমানাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে মৎস্য কার্যালয়। তাদের দেওয়া তথ্যে ২৮৫ মেট্রিক টন ইলিশ এবং এক লাখ ৭২৫ মেট্রিক টন জাল জব্দের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। জব্দ করা এসব মাছ ও জালের বাজারমূল্য যথাক্রমে ২৬ লাখ ৯৪০ টাকা বলে জানানো হয়েছে। এ ছাড়া ১২টি মামলায় ছয়জন জেলেকে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে।
গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ভিক্টর বাইন বলেন, ‘মৎস্য অফিস ও সরকার ঘোষিত বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। প্রতিদিনই একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। গলাচিপার অনেক এলাকা দুর্গম ও প্রত্যন্ত হওয়ায় সব জায়গায় দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হয় না। তবে এসব এলাকাতেও অভিযান চালানো হচ্ছে।’
চরবিশ্বাসের নোমোর স্লুইস এলাকায় অভিযানের সময় বাধার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এলাকাটি দুর্গম। সেখানে অভিযান চলাকালে সংঘবদ্ধ একটি চক্র তাঁদের ওপর হামলার চেষ্টা করে এবং ডাকচিৎকার করে। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয় বলে জানান তিনি।’



