শয্যা বাড়লেও সেবা সীমিত

সংগৃহীত ছবি
কুমিল্লার মেঘনা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল প্রায় পাঁচ বছর আগে। অবকাঠামোগতভাবে হাসপাতালটি বর্তমানে ৫০ শয্যার ভিত্তিতে পরিচালিত হলেও এখনো মেলেনি চূড়ান্ত অনুমোদন। ফলে বাড়তি রোগীর চাপ সামাল দিতে হচ্ছে পুরনো জনবল, সীমিত বাজেট ও অপর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়েই।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, অনুমোদন না পাওয়ায় বাড়ানো যায়নি চিকিৎসক, নার্স কিংবা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদের সংখ্যা। একই সঙ্গে বাড়েনি ওষুধ, খাদ্য ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতের বরাদ্দও। এর প্রভাব পড়ছে চিকিৎসাসেবার মানের ওপর। আশপাশের কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের প্রায় দুই লাখ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম ভরসা এই হাসপাতাল।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের জুলাইয়ে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করার জন্য পাঠানো হয় প্রস্তাব। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সে প্রস্তাব এখনো হয়নি অনুমোদন। এর মধ্যেই বাড়তি শয্যা নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
বর্তমানে হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৪৫০ থেকে ৫০০ রোগী। ইনডোর বিভাগে ভর্তি থাকছেন গড়ে ৪০ জন রোগী। তবে রোগীর সংখ্যা বাড়লেও সেই অনুপাতে বাড়েনি জনবল কিংবা সেবাসামগ্রী। ফলে সীমিত সম্পদ দিয়েই অব্যাহত রাখতে হচ্ছে সেবা।
জনবল কাঠামো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ৩১ শয্যার হাসপাতালের জন্য অনুমোদিত চিকিৎসকের পদ ২৬টি। তবে কর্মরত ২০ জন। নার্স ও মিডওয়াইফের ২৯টি পদের মধ্যে দায়িত্ব পালন করছেন ১৪ জন। এ ছাড়া আবাসিক মেডিকেল অফিসার, সনোলজিস্ট, সার্জারি বিভাগের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, স্টোরকিপার, অ্যাম্বুলেন্স চালক, কোষাধ্যক্ষ এবং উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। সব মিলিয়ে ১২৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে কর্মরত ৭৭ জন। বাকি পদগুলো খালি। কয়েকজন শিক্ষা ও মাতৃত্বকালীন ছুটিতে থাকায় কার্যকর জনবল আরও কমে গেছে।
চিকিৎসা নিতে আসা আওলাদ হোসেন বলেছেন, ‘স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসার পর প্রায় ২ ঘণ্টা করতে হয়েছে অপেক্ষা। পরে চিকিৎসক অন্যান্য রোগী দেখে আল্ট্রাসনোগ্রাম করেন। চিকিৎসক সংকটের কারণে রোগীদের দীর্ঘ সময় করতে হচ্ছে অপেক্ষা।’
হাসপাতালটিতে প্রতি মাসে শতাধিক স্বাভাবিক প্রসবের সক্ষমতা থাকলেও জনবল সংকটের কারণে অস্ত্রোপচার ও অন্যান্য অপারেশন পরিচালিত হচ্ছে সীমিত পরিসরে। একজন মিডওয়াইফ দিয়ে পরিচালনা করতে হচ্ছে প্রসূতিসেবা। ফলে জটিল রোগী ও প্রসূতিদের অনেক ক্ষেত্রেই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ পাঠাতে হচ্ছে অন্যান্য উচ্চতর চিকিৎসাকেন্দ্রে।
হাসপাতাল-সংশ্লিষ্টদের মতে, ৫০ শয্যার অনুমোদন পেলে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পদ সৃষ্টি হতো এবং চিকিৎসাসেবার পরিধি ও মান বাড়ত।
রোগীর সংখ্যা বাড়লেও খাদ্য বরাদ্দ এখন পর্যন্ত ৩১ শয্যার হিসাবেই দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। তারা বলছেন, ৫০ শয্যার রোগীদের জন্য একই বরাদ্দ থেকে সরবরাহ করতে হচ্ছে খাবার। এতে খাবারের পরিমাণ ও মান নিয়ে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে অসন্তোষ। একই সঙ্গে ওষুধ ও অন্যান্য পরিচালন ব্যয়েও দেখা দিয়েছে চাপ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সায়মা রহমানের ভাষায়, জরুরি বিভাগে রোগীদের সন্তোষজনক সেবা দিতে পর্যাপ্ত জনবল নেই। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের আটটি অনুমোদিত পদের মধ্যে বর্তমানে কর্মরত মাত্র দুজন।
তিনি বলেছেন, ‘জনবল সংকটের কারণে অনেক সময় রোগীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্ভব হয় না সেবা দেওয়া। ফলে তারা বিষয়টি ভুলভাবে মূল্যায়ন করেন।’
হাসপাতালের আর্থিক সংকটের বিষয়টিও তুলে ধরেন তিনি। ডা. সায়মা রহমান জানালেন, আউটসোর্সিং কর্মীরা ছয় মাস ধরে পাননি বেতন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ না থাকায় হাসপাতালের পরিবেশ রক্ষা করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
‘সীমিত জনবল ও সক্ষমতা নিয়েই চেষ্টা করছি আমরা সর্বোচ্চ সেবা দেওয়ার। চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে’— বললেন এই চিকিৎসক।




