কুয়াকাটায় হোটেলের লাইসেন্স নবায়নের আশ্বাসে ঘুষ আদায়, হাতেনাতে আটক শ্রম পরিদর্শক

মো. শাহাব উদ্দিন। ছবি: আগামীর সময়
পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় আবাসিক হোটেলের লাইসেন্স নবায়ন ও নতুন লাইসেন্স করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগে মো. শাহাব উদ্দিন নামে এক শ্রম পরিদর্শককে হাতেনাতে আটক করেছেন হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।
এ সময় তিনটি হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নেওয়া মোট ৩৭ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়। পরে উদ্ধার করা টাকা হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে ফেরত দেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান।
গতকাল শুক্রবার রাত ৯টার দিকে কুয়াকাটা প্যালেস ও হোটেল শৈবালে লাইসেন্স নবায়নের কথা বলে ৫০ হাজার টাকা দাবি করার অভিযোগে তাকে আটক করা হয়।
হোটেল মালিকদের অভিযোগ, ওই দিন সকাল থেকে কুয়াকাটার বিভিন্ন আবাসিক হোটেলে গিয়ে নতুন লাইসেন্স ও নবায়নের কথা বলে টাকা আদায় করেন শ্রম পরিদর্শক শাহাব।
হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা জানান, গত দুই বছর ধরে ওই কর্মকর্তা বিভিন্ন হোটেল মালিককে মামলার ভয় দেখিয়ে গোপনে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছেন। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার আলোচনা করেও কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি।
হোটেল সাউথ স্টারের পরিচালক মো. মিঠুন জানান, কয়েক দিন আগে ওই শ্রম পরিদর্শক তাদের হোটেলে গিয়ে ২৫ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করেন। পরে শুক্রবার বিকালে হোটেলে এসে ৩০ হাজার টাকা দিলে মামলা তুলে নেওয়া এবং ভবিষ্যতে হয়রানি না করার আশ্বাস দেন। এরপর তারা তাকে টাকা দেন।
হোটেল সি-লেভের মালিক মো. সবুজ জানান, কয়েক মাস আগে মামলার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে ৩৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছিল।
শুক্রবার আবারও লাইসেন্স নবায়নের জন্য ৮ হাজার টাকা দাবি করেন ওই কর্মকর্তা। তার কাছে পুরো টাকা না থাকায় ৫ হাজার টাকা দেন এবং বাকি ৩ হাজার টাকা রাতে বিকাশের মাধ্যমে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি।
হোটেল রিয়াজের (আবাসিক) মালিক জুবায়ের আহম্মেদ রিয়াজ খান জানিয়েছেন, ওই শ্রম পরিদর্শক নিজের পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন হোটেলের ভিজিটিং কার্ড ও মালিকদের নাম সংগ্রহ করতেন। পরে নোটিস পাঠিয়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে লাইসেন্সের জন্য কখনো ৩০ হাজার, আবার কখনো ৪০ হাজার টাকা দাবি করতেন। টাকা না দিলে সংশ্লিষ্ট হোটেলের বিরুদ্ধে মামলা করা হতো। এভাবেই কৌশলে ঘুষ আদায় করতেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক জসিম উদ্দিন বাবুল ভূঁইয়া জানান, গত দুই বছর ধরে ওই কর্মকর্তা গোপনে হোটেল মালিকদের কাছ থেকে টাকা আদায় করছেন। এ বিষয়ে তাকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উপস্থিতিতে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সরকারি কোষাগারে নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে কীভাবে লাইসেন্স করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি। বরং তিনি মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করেছেন। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে ওই কর্মকর্তাকে কুয়াকাটা থেকে প্রত্যাহার এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
বরিশাল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক নবীন হাওলাদার জানিয়েছেন, তারা জানতে পেরেছেন, শাহাব উদ্দিন ব্যক্তিগতভাবে কুয়াকাটায় বেড়াতে গিয়েছিলেন। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে নগদ টাকা গ্রহণের কোনো সুযোগ নেই। তাদের দপ্তরে এ, বি ও সি ক্যাটাগরিতে লাইসেন্স দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। লাইসেন্স নবায়নের সর্বোচ্চ ফি হতে পারে ১ হাজার ৫০০ টাকা। ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান জানান, শ্রম পরিদর্শক মো. শাহাব উদ্দিন বিভিন্ন স্থানে গিয়ে টাকা নিচ্ছেন এমন খবর পেয়ে তিনি ঘটনাস্থলে যান। সেখানে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। পরে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রতিবেদন পাঠানো হবে, যাতে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
অভিযুক্ত মো. শাহাব উদ্দিন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের শ্রম পরিদর্শক (সাধারণ)। তিনি ৩৮তম বিসিএসের নন-ক্যাডার কর্মকর্তা। গত চার বছর ধরে তিনি বরিশালে কর্মরত রয়েছেন।




