মেহেরপুর
গরুর চামড়া ৫০০, ছাগলেরটা ফ্রি!

ছবি: আগামীর সময়
কোরবানির পশুর মাংস যেমন গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়, ঠিক তেমনি পশুর চামড়া বিক্রির পুরো টাকাটাও মেহেরপুরের কোরবানিদাতারা তুলে দেন অভাবী মানুষের হাতে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরের মতো এবারও চামড়া বিক্রির সেই টাকা গরিবের মুখে হাসি ফোটাতে পারল না। মেহেরপুরে চামড়া ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট আর ফড়িয়াদের কারসাজিতে সরকার নির্ধারিত দামের কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছে না। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে, একটা গরুর চামড়া বিক্রি করতে বিক্রেতাকে ছাগল বা ভেড়ার চামড়া ‘ফ্রি’ দিতে হচ্ছে!
জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মেহেরপুরের তিনটি উপজেলা ও দুটি পৌরসভায় এবার প্রায় ৯০ হাজার পশু কোরবানির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলেও, বাস্তবে কোরবানি হয়েছে লক্ষাধিক। কিন্তু বিপুল পরিমাণ এই চামড়া নিয়ে এখন বিপাকে পড়েছেন সাধারণ মানুষ ও বিভিন্ন মাদ্রাসার প্রতিনিধিরা। সরকার নির্ধারিত চামড়ার দাম সম্পর্কে সাধারণ মানুষ অবগত না থাকার সুযোগটি পুরোপুরি লুফে নিচ্ছে স্থানীয় ফড়িয়ারা।
ঈদের দিন বৃহস্পতিবার (২৮ মে) দুপুর এবং আজ শুক্রবার (২৯ মে) সকাল থেকে জেলার নওয়াপাড়া, ভাটপাড়া, সাহারবাটী, চৌগাছা, গাংনী, মুজিবনগর, দারিয়াপুর ও শিবপুর গোচর গ্রাম ঘুরে চামড়া বাজারের এই করুণ চিত্র দেখা গেছে। আকারভেদে ছাগল ও ভেড়ার চামড়া মাত্র ১০, ১৫ বা ২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অনেক জায়গায় চামড়া কেনার লোক না পেয়ে কোরবানিদাতারা বাধ্য হয়ে তা মিসকিনদের হাতেই তুলে দিয়েছেন। ৪ থেকে ৫ মণ ওজনের বড় গরুর চামড়াও বিক্রি হচ্ছে মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায়।
গাংনীর ভাটপাড়া গ্রামের সমাজপ্রধান রফিকুল ইসলাম তাঁর অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বললেন, 'চামড়ার কোনো চাহিদাই নেই। কুরবানির পশুর চামড়া কেউ কিনতে চাচ্ছিলেন না। অবশেষে স্থানীয় এক ফড়িয়া এসে খাসির চামড়া প্রতি পিস ৪০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ১০ টাকা দরে কিনে নিয়েছেন। অনেক মিসকিন এসেছিলেন কোরবানির গোশত নিতে, তাঁদের চামড়া দিয়ে দিয়েছি; তাঁরা যে দরে পারে বিক্রি করবে।'
ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের অবশ্য নিজস্ব অজুহাত রয়েছে। নওয়াপাড়ার ফড়িয়া ব্যবসায়ী সজিব জানান, তিনি ছাগলের চামড়া ১০ টাকায় কিনে আড়তে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি করছেন। তবে লবণের বাড়তি দাম ও পরিবহন খরচ বাদ দিলে প্রতি পিস চামড়ায় তাঁর ১৫ থেকে ২০ টাকার বেশি লাভ থাকবে না। বামুন্দীর চামড়ার আড়তদার শফিকুলও জানালেন একই কথা। চাহিদা না থাকায় লসের ঝুঁকিতে আছেন তাঁরা।
গাংনীর চামড়া ব্যবসায়ী হাফিজুর রহমান জানালেন, 'আমরা বগুড়া, নাটোর, সিরাজগঞ্জ ও কুষ্টিয়ায় চামড়া বিক্রি করি, কিন্তু সেখানে সরকার নির্ধারিত দাম পাচ্ছি না। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের প্রধান উপাদান লবণ আগে কিনতাম ১০ টাকা কেজি, এখন কিনতে হচ্ছে ২০ টাকায়। এর সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি ৫০০ টাকা আর পরিবহন খরচ তো আছেই।'
চৌগাছার চামড়া ব্যবসায়ী নিমাই দাসের মতে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় এই চামড়া শিল্প আজ ধ্বংসের মুখে। চামড়ার তৈরি জিনিসের দাম বাড়লেও কাঁচামালের দাম মিলছে না। মেহেরপুর চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক আব্দুল ওহাবও স্বীকার করলেন সিন্ডিকেটের কথা। তার ভাষ্য, 'এলাকাভিত্তিক ফড়িয়ারা সিন্ডিকেট করে চামড়া কিনতে চায় না, ফলে প্রান্তিক মানুষ ফড়িয়াদের বলা দামেই চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়। দেশের বাজারে চাহিদা না বাড়লে প্রান্তিক মানুষ ন্যায্যমূল্য পাবে না।'
অথচ কাগজে-কলমে দামের চিত্রটি একেবারেই ভিন্ন। মেহেরপুর জেলা প্রশাসক শিল্পী রানী জানান, ২০২৬ সালের ঈদুল আজহা উপলক্ষে সরকার লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে। এবার প্রতি স্কয়ার ফুট গরুর চামড়া ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, খাসির চামড়া ২৭ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২০ থেকে ২৩ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে—যা গত বছরের তুলনায় ২ থেকে ৩ টাকা বেশি।
কিন্তু প্রশাসনের এই বেঁধে দেওয়া দাম কেবল খাতার পাতায়ই রয়ে গেছে। মাঠপর্যায়ে তদারকির অভাবে মেহেরপুরের কোরবানিদাতারা ও গরিব-মিসকিনরা বঞ্চিত হচ্ছেন তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে, আর পানির দরে বিক্রি হয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম মূল্যবান এই সম্পদ।






