রাজশাহী
কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছে দিতে গিয়ে দুই পা হারালেন ট্যাগ অফিসার

সুলতানুল ইসলাম
হাতে ছিল এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। সামনে ছিল রাষ্ট্রের অর্পিত একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সময়মতো প্রশ্নপত্র পৌঁছে দিতে যাচ্ছিলেন পরীক্ষাকেন্দ্রে। কিন্তু গন্তব্যে আর পৌঁছানো হলো না। একটি বেপরোয়া ট্রাক মুহূর্তেই বদলে দিল তার পুরো জীবন।
বুধবার (২৯ জুলাই) সকাল ৯টার দিকে রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাইপাস মহাসড়কের কাশিয়াডাঙ্গা কলেজের সামনে ঘটে সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। দুই পা হারিয়ে এখন পবা উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা ও কাশিয়াডাঙ্গা কলেজ এইচএসসি পরীক্ষাকেন্দ্রের ট্যাগ অফিসার মো. সুলতানুল ইসলাম (৫৪) রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন।
এদিন রাতেই এ ঘটনায় ট্রাকচালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তার এই ট্র্যাজেডি রাজশাহীতে আবারও সামনে এনেছে নিরাপদ সড়কের প্রশ্ন।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) বিকেলে রামেক হাসপাতালের আইসিইউতে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নিথর হয়ে শুয়ে আছেন সুলতানুল ইসলাম। চিকিৎসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে চলছে তার চিকিৎসা। শরীরজুড়ে চিকিৎসা সরঞ্জাম। বাইরে উৎকণ্ঠায় অপেক্ষা করছেন স্বজনরা। কারও চোখে অশ্রু, কারও মুখে নীরবতা। সবাই একটি সুসংবাদের অপেক্ষায়।
চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তার জীবন বাঁচাতে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা কেটে ফেলতে হয়েছে। মাথার পেছনের অংশ ও বাম চোখেও গুরুতর আঘাত রয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা এখনও আশঙ্কাজনক।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, কাশিয়াডাঙ্গা কলেজের সামনে পৌঁছালে যশোর ট-১১-৩০১৩ নম্বরের একটি ট্রাক বেপরোয়া গতিতে তার মোটরসাইকেলকে ধাক্কা দেয়। তিনি সড়কে ছিটকে পড়লে ট্রাকটি তার দুই পা ও মোটরসাইকেলের ওপর দিয়ে চলে যায়। পরে চালক ট্রাক ফেলে পালিয়ে যান। পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় লোকজন তাঁকে উদ্ধার করে রামেক হাসপাতালে ভর্তি করেন।
এই দুর্ঘটনার পরপরই কাশিয়াডাঙ্গা কলেজ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে শোক ও ক্ষোভ। শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দারা কাশিয়াডাঙ্গা মোড়ে সড়ক অবরোধ করেন। তাদের অভিযোগ, কলেজের সামনে পুলিশ বক্স থাকলেও কার্যকর ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ নেই। নেই স্পিড ব্রেকার, নেই জেব্রা ক্রসিং। প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই সড়ক পার হয়। কিন্তু দীর্ঘদিনেও নেওয়া হয়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ।
বিক্ষোভকারীরা পুলিশ বক্সের কার্যকারিতা বাড়ানো, নিয়মিত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, স্পিড ব্রেকার নির্মাণ, জেব্রা ক্রসিং স্থাপন এবং দ্রুত সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জ বাইপাস মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকে। দুই পাশে সৃষ্টি হয় দীর্ঘ যানজট।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম। তিনি বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দাবিগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন।
জেলা প্রশাসক বলেছেন, ‘রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন দুর্ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আহত কর্মকর্তার সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার থেকেই স্পিড ব্রেকার নির্মাণসহ প্রয়োজনীয় সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
পবা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইবনুল আবেদীন বলেন, ‘রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতে গিয়েই সুলতানুল ইসলাম এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন। তাঁর চিকিৎসা ও পরিবারের পাশে উপজেলা প্রশাসন রয়েছে।’
কাশিয়াডাঙ্গা থানার ওসি ফরহাদ আলী জানান, আহত কর্মকর্তার ছোট বোনের স্বামী আজাহার ইসলাম বাদী হয়ে বুধবার রাতে ট্রাকচালক রতন রায়ের বিরুদ্ধে কাশিয়াডাঙ্গা থানায় সড়ক পরিবহন আইনে মামলা করেছেন। পুলিশ ট্রাকটি জব্দ করেছে। চালককে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।





