তিস্তার চরে আশ্বিন-কার্তিকের অভাব

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভোর হলেই ঘর ছাড়েন আব্দুল কাইয়ুম। তিস্তার ছালাপাকচর থেকে রংপুর নগরের শিমুলবাগ। দীর্ঘ এ পথ পাড়ি দেন কাজের আশায়। কিন্তু প্রতিদিন কাজ জোটে না। এক দিন কাজ পেলে পরের তিন দিনই ফিরতে হয় খালি হাতে। এদিকে কাজ না পেলে ঘরে চুলা জ্বলে না। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনাহারে-অর্ধাহারেই কাটাতে হয় দিন।
রংপুরের তিস্তার চরাঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক এলেই দেখা দেয় কাজের সংকট। রোপা আমন ধান রোপণের পর কাটাই-মাড়াই শুরু হতে দেরি হওয়ায় কমে যায় কৃষিকাজ। সপ্তাহে তিন দিনের বেশি কাজ না মেলায় সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন কাইয়ুমের মতো শ্রমিকেরা। তার ওপর চালসহ নিত্যপণ্যের বাড়তি দাম আর অতিদরিদ্রদের জন্য সরকারের কর্মসংস্থান কর্মসূচির বরাদ্দ না আসায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে।
শিমুলবাগে কাজের অপেক্ষায় বসে থাকা আব্দুল কাইয়ুম বললেন, ‘প্রতিদিন বিয়ানে (সকালে) আল্লাহর নামে বাড়ি থাকি বেরাই, যদি কাম জোটে। ছাওয়াগুলার (সন্তান) মুখোত খাওন দেওয়া নাগবে। কিন্তুক এক দিন কাম জোটলে তিন দিন খালি হাতে নিরাশ হয়্যা ফিরি যাওয়া নাগে।’
একই হাটে কাজের অপেক্ষায় ছিলেন গঙ্গাচড়ার শংকরদহ চর থেকে আসা ৬৫ বছর বয়সী আব্দুল কাচু মামুদ। প্রায় ২০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে এসেছেন তিনি। ক্ষুধায় ক্লান্ত শরীরে কাজের অপেক্ষায় বসে থেকে বললেন, ‘কাইল থাকি বউ-ছাওয়া নিয়া কষ্টে আছি। সকালে খালি প্যাটে আচ্চু (এসেছি)। কাম জোটলে খরচ করি বাড়িত যাইম, না জোটলে আইজও না খ্যায়া থাকা নাগবে।’
শুধু কাইয়ুম বা কাচু মামুদ নন, তাদের মতো বহু শ্রমজীবী মানুষ এখন কাজের অভাবে পরিবার নিয়ে সংকটে দিন কাটাচ্ছেন। শিমুলবাগে আরও অন্তত ৩০ জন শ্রমিককে জড়ো হতে দেখা যায়। তাদের মধ্যে নওশা মিয়া, ওমর আলী, নয়া মিয়াসহ কয়েকজন জানালেন, সপ্তাহে তিন দিনের বেশি কাজ মেলে না। চালসহ নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর মধ্যে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত অতিদরিদ্রদের জন্য সরকারের কর্মসংস্থান কর্মসূচির বরাদ্দ না আসায় তাদের দুর্দশা আরও বেড়েছে।
রংপুর অঞ্চলে আশ্বিন-কার্তিক মাস কৃষি শ্রমিকদের জন্য সংকটের সময়। রোপা আমন রোপণের পর ধান কাটা-মাড়াই শুরু হওয়ার আগপর্যন্ত কৃষিকাজ কমে যায়। ফলে মৌসুমি বেকারত্বে পড়েন বহু শ্রমজীবী মানুষ।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রংপুরে কৃষিশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ। তিস্তার চরাঞ্চল ছাড়াও গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও তারাগঞ্জের শ্রমিকরা এ সময়ে কাজের সন্ধানে বিভিন্ন এলাকায় ছুটে বেড়ান। তাদের অনেকের সাইকেলের পেছনে বাঁধা থাকে ডালি, কাস্তে, কোদাল, দা ও খন্তার মতো কাজের সরঞ্জাম। শিমুলবাগ, জামতলা মোড়, কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল, বেতপট্টি ও রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় শ্রমিকরা কাজের আশায় অপেক্ষা করেন। কাজ পেলে দৈনিক মজুরি পান ৫০০ টাকা; না পেলে ফিরতে হয় শূন্য হাতে।
স্থানীয় ইউপি সদস্য রমজান আলীর ভাষ্য, শংকরদহ চরের ৪০০ পরিবারের মধ্যে নদীভাঙনে অর্ধেক পরিবার অন্যত্র চলে গেছে। বর্তমানে সেখানে থাকা প্রায় ২০০ পরিবারের সদস্যরা শ্রম বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
মৌসুমি বেকারত্বের এ সময়ে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্য সংকট মোকাবিলায় সরকারের অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত বরাদ্দ না আসায় সে সুযোগও তৈরি হয়নি। রংপুরের উন্নয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. তুহিন ওয়াদুদ। তার মতে, কর্মহীন মানুষকে মূল ধারায় আনতে না পারলে দেশের দারিদ্র্য পরিস্থিতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
শ্রমজীবীদের কাজের সংকটের কথা স্বীকার করেছেন রংপুর জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা গোলাম কিবরিয়া। তিনি বলেছেন, ‘এ সময়ে শ্রমজীবী মানুষের দুর্দিন চলে, এটা ঠিক। পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতি বছর কর্মসংস্থান কর্মসূচি চালু থাকে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে এ কর্মসূচির বরাদ্দ আসার কথা ছিল। তবে চলতি অর্থবছরে এখন পর্যন্ত তা আসেনি।’ তার আশা, শিগগির বরাদ্দ আসবে।




