শিশু হাসপাতাল আছে শিশু চিকিৎসা নেই

ছবিঃ আগামীর সময়
চিত্র-১: শয্যা ছাড়িয়ে বারান্দা ও সিঁড়ির নিচে বিছানা। শিশু রোগী নিয়ে কোনো রকমে পড়ে আছেন অভিভাবকরা। এ ছবি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু ও নবজাতক বিভাগের।
চিত্র-২: এক চিলতে জায়গা—বেডের ফাঁক গলিয়ে । কোনো রকমে যেখানে রোগীর স্বজন বা চিকিৎসক দাঁড়ান। সেখানেও চাদর পেতে শিশু রোগী নিয়ে পড়ে আছেন মা-বাবা। ফোকাস পয়েন্টে খুলনা জেনারেল হাসপাতাল।
চিত্র-৩: মাদুর পেতে আদরের সন্তানকে নিয়ে বারান্দায় শিশু রোগীর স্বজন। খুলনা শিশু হাসপাতালের চিত্র, যা চলে বেসরকারি একটি ফাউন্ডেশনের কৃপায়।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এমন অব্যবস্থা ও অভিযোগের খণ্ডচিত্র সারা দেশে অসংখ্য। কিন্তু শিশু চিকিৎসার এই লজ্জাজনক খণ্ডচিত্র খুলনার। এ কারণে লজ্জার— খুলনায় একটি অত্যাধুনিক শিশু হাসাপাতল সেজেগুজে তৈরি। সেটাও প্রায় দুই বছর ধরে।
নতুন বিল্ডিং, নতুন বিভাগ তৈরি। অথচ সদিচ্ছা নেই— এই কাঠামো কাজে লাগানোর। হাসপাতাল স্তর থেকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর— সর্বত্রই ঢিলেঢালা মনোভাব। অসুস্থ শিশুদের গোঙানি আর শিশুদের চিরবিদায় দেওয়া স্বজনদের আর্তচিৎকার বারবার ধাক্কা খাচ্ছে গোটা স্বাস্থ্য ব্যবস্থায়।
শীর্ষ বাজেট খরচকারী খাতের একটি স্বাস্থ্য। এত টাকা যেখানে খরচ করা হচ্ছে, তা নিয়ে এত প্রশ্ন কেন? খোদ শাসক দলের শীর্ষ নেতৃত্বকেই বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে শুনতে হচ্ছে, পর্যাপ্ত চিকিৎসক নেই, প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই, পরীক্ষা ঠিকমতো হয় না!
স্বাস্থ্য স্তরের ধাপে ধাপে কেনা হয়েছে প্রচুর অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি, যা ব্যবহারের জন্য অনেক জায়গায় নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক বা টেকনোলজিস্ট। আর যেখানে তা আছে, সেখানে দেখা যাচ্ছে কুঁড়েমি মনোভাব। দামি যন্ত্রপাতি দিনের পর দিন স্রেফ পড়ে রয়েছে বহু মেডিকেল কলেজেই, যা নিয়ে বড়সড় প্রশ্নের মুখে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। শুধু যন্ত্রপাতি কিনে তা হাসপাতালে পাঠিয়েই কি দায়িত্ব শেষ স্বাস্থ্য প্রশাসনের— প্রশ্ন উঠেছে সংশ্লিষ্ট মহলে। হামের প্রকোপের মুখে এসব প্রশ্ন আরও বড় হয়ে আলোচনায় আসছে।প্রশাসনিকভাবে বিভাগীয় শহর খুলনা। সাধারণ সরকারি হাসপাতাল আছে। শিশু চিকিৎসার জন্য ছুটতে হয় এসবেই। খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের (খুমেক) ঠিক কয়েক কিলোমিটার দূরেই দাঁড়িয়ে ১১৫ কোটি টাকার হাসপাতাল ভবন, যা গড়া হয়েছে শিশুদের বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য। ২০২৪ সালেই বানানো শেষ করেছে পূর্ত বিভাগ। এবার তাদের কাছ থেকে বুঝে নিয়ে তা চালু করার দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগের। কিন্তু স্বাস্থ্যের মন গলছে না। একবার দুইবার করে করে সাত দফা চিঠি গেছে পূর্ত থেকে স্বাস্থ্যে। তাদের সাড়া মেলে না। তাদের কথা কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ দেখানো হলেও হাসপাতালটি অরক্ষিত। সীমানা প্রাচীরের সঙ্গে নেই গেটও। আসবাব ও জনবলের ব্যবস্থাও নেই, যা গণপূর্ত জানে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
তালাবদ্ধ নতুন এই ভবন সাক্ষ্য দিচ্ছে দেশের স্বাস্থ্য খাতে অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার। আধুনিক চিকিৎসার স্বপ্ন নিয়ে নির্মিত পাঁচতলা এই হাসপাতালটি এখন নিজেই ‘রোগাক্রান্ত’। কোথাও খসে পড়ছে পলেস্তারা, চোখে পড়ে ফাটলও। সীমানা প্রাচীর না থাকায় চরছে গরু-ছাগলের পাল। রয়েছে কুকুর-বিড়ালের বিচরণও। দুই বিভাগের ঠেলাঠেলিতে দুই বছর ধরে ঝুলে আছে ভবনটির চাবি হস্তান্তর। ‘পাটায় পুতায় ঘষাঘষি, মরিচের জীবন যায়’— প্রবাদের মরিচের মতো মরছে শিশুরা।
খুলনায় শিশুদের চিকিৎসায় আলাদা কোনো সরকারি হাসপাতাল না থাকায় খুমেকের শিশু ও নবজাতক ওয়ার্ডই ভরসা, যা সব সময়ই ঠাসা তিন গুণ বেশি রোগীতে। নিরুপায় অভিবাবক ছোটেন বেসরকারি হাসপাতালে। অথচ বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল নির্মাণে আশায় বুক বাঁধেন স্থানীয়রা। ১১৫ কোটি টাকার পাঁচতলা হাসপাতালটি দাঁড়িয়েছিল আশার প্রতীক হয়ে। ভবনটির নির্মাণকাজ শেষ হলে কম খরচে মিলবে উন্নত চিকিৎসাসেবা। কিন্তু তা আর হলো কই? এখনো শেষ হয়নি চিঠি চালাচালি।
কেনা হয়নি আসবাবপত্র-যন্ত্রপাতি। নেওয়া হয়নি জনবলও। আর স্বাস্থ্য বিভাগ বুঝে নেওয়ার আগেই নির্মাণকাজের মান ও স্থায়িত্ব নিয়ে জনমনে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দুই বিভাগের ঠেলাঠেলিতে নাগরিক স্বাস্থ্যের করুণ দশা। শুধু শিশু ওয়ার্ডের এমন করুণ চিত্রই নয়; আরও নানান সংকটের তথ্য জানালেন স্পেশাল কেয়ার নিউবর্ন (স্ক্যানু) ইউনিটের ইনচার্জ নাজমা খানম। ‘অসুস্থ, অপরিণত বা কম ওজনের নবজাতকদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসায় হাসপাতালে চালু রয়েছে মাত্র ৪৪টি স্ক্যানু শয্যা। এর প্রতিটি শয্যায় রাখা হচ্ছে তিন থেকে চারটি করে নবজাতক। ১৬টি ওয়ার্ম মেশিনের মধ্যে ১০টিই অকেজো। বাকি মাত্র ছয়টি মেশিন দিয়েই চলছে সেবাদান।’
খুমেক হাসপাতালের ৪৮টি শয্যা ও ৪৪টি স্ক্যানু এবং জেনারেল হাসপাতালের ছয়টি শয্যার অপ্রতুল সেবা ছাড়া শিশুদের জন্য নেই আলাদা কোনো সরকারি হাসপাতাল। এই যখন অবস্থা তখন ২০১৭ সালে খুলনা বিভাগীয় শিশু হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন দেয় সরকার।
এরপর বটিয়াঘাটার কৃষ্ণনগর ও ডুমুরিয়ার চকমথুরাবাদে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ময়ূরী আবাসিক এলাকার বিপরীতে চূড়ান্ত করা হয় জমি । জেলা প্রশাসন ৪ দশমিক ৮ একর জমি অধিগ্রহণ করে হস্তান্তর করে গণপূর্ত বিভাগের কাছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, হাসপাতালের ভেতরে আরসিসি ঢালাইয়ের রাস্তা। দক্ষিণ দিকে সীমানা প্রাচীর অসমাপ্ত ও প্রধান ফটকে নেই গেট। ফলে গরু-ছাগল ও কুকুর অবাধে চরছে, নোংরা হচ্ছে হাসপাতাল প্রাঙ্গণ। রোদ-বৃষ্টিতে পাঁচতলা ভবনের সৌন্দর্য ফিকে হয়ে গেছে, পলেস্তারায় জমেছে ময়লার স্তর। ভবনের নিচের বিমের পাশ দিয়ে দেখা দিয়েছে ছোট-বড় একাধিক ফাটল।
শতকোটি টাকার এই ভবন নির্মাণে বড় ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ তুললেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) খুলনার সম্পাদক খুদরত-ই-খুদা। ‘তদারকির অভাবে এস্টিমেট অনুযায়ী কাজ হয়নি। বড় ধরনের দুর্নীতি হওয়ায় কাজের মান খারাপ হয়েছে। এজন্যই মূলত ফাটল ধরেছে।’
‘খুলনা বিভাগের বিপুল জনগোষ্ঠীর জন্য শিশুদের চিকিৎসাসেবার সুযোগ একেবারেই অপ্রতুল। তাই কোনো দোহাই দিয়ে হাসপাতাল চালু না করে তালাবদ্ধ রাখা দায়িত্বহীনতার পরিচয়। বিষয়টি সমাধানে সংশ্লিষ্টদের মনোযোগী হওয়া উচিত।’— একরাশ ক্ষোভ ঝারলেন এই নাগরিক অধিকারকর্মী।
তবে ভবনটি নির্মাণে কোনো ধরনের দুর্নীতি হয়নি বলে দাবি খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী কামরুল হাসানের। দায় চাপালেন জমির ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর। ‘আগে জায়গাটি অনেক নিচু ছিল। মাটি ও বালু ফেলে ভরাট করে স্থাপনা নির্মিত হয়েছে। নতুন মাটি ও বালু মাটি সেটেলমেন্ট হওয়ায় সম্প্রতি ফাটল ধরেছে। হস্তান্তরের আগেই ফাটলসহ সবকিছু ঠিক করে তারপর বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’
ভবন হস্তান্তরে বিলম্বের দায় নিতেও নারাজ গণপূর্তের এই কর্মকর্তা। ‘জমি অধিগ্রহণে বিলম্ব এবং কাজ শুরুর পর প্রবেশপথ নিয়ে জটিলতায় কাজ বাস্তবায়নে দেরি হয়েছে। তবে ২০২৪ সালের জুনে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হয়। এরপর নির্মাণকাজ বুঝে নিতে খুলনার সিভিল সার্জনকে সাতবার চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।’
খুলনার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. মিজানুর রহমান গণপূর্তের চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করেন। তবে এমন বেহাল দশায় স্বাস্থ্য বিভাগ ভবনটি বুঝে নিতে রাজি নয় বলে জানান। ‘কাগজে-কলমে প্রকল্প শেষ দেখানো হলেও হাসপাতালের একপাশে প্রাচীর ও প্রধান ফটকে গেট নেই। ফলে হাসপাতালটি অরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া কার্যক্রম শুরুর জন্য আসবাবপত্র ও জনবলের ব্যবস্থা নেই। এ কারণে চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। সবকিছুই চিঠির মাধ্যমে গণপূর্তসহ সংশ্লিষ্টদের অবহিত করা হয়েছে।’
সীমানা প্রাচীর ও প্রধান ফটক প্রসঙ্গে গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী জানালেন, সমাপ্ত প্রকল্পে পুরো বাউন্ডারি ওয়াল ও মেইন গেটের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল না। তবে ভবনটি ছয় থেকে দশতলা পর্যন্ত সম্প্রসারণসহ বাকি রাস্তা, বাউন্ডারি ওয়াল, ড্রেন, মেইন গেট, নার্স ও স্টাফ কোয়ার্টার নির্মাণে ৯৮ কোটি টাকার নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে এ প্রকল্পে অনুমোদন মেলেনি। আপাতত এখন শুধু গেট ও বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে ৮ কোটি টাকা বরাদ্দে প্রশাসনিক অনুমোদন চাওয়া হয়েছে।
হাসপাতালটি নিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বহু আশা ছিল। শিশুরা পাবে উন্নত চিকিৎসা। কিন্তু ভবন নির্মাণকাজ বাস্তবায়নে দীর্ঘ সময় এবং এখন তা চালু নিয়েও দেখা দিয়েছে জটিলতা। খুলনাবাসীর দাবি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর অজুহাতের বেড়াজাল ছিন্ন করে দ্রুত মেরামত ও জনবল নিয়োগের মাধ্যমে হাসপাতালটি চালু করা হোক। দক্ষিণাঞ্চলের অবুঝ শিশুদের জীবন নিয়ে আর যেন কোনো টালবাহানা না হয়—এখন এটাই সাধারণ মানুষের চাওয়া।

