ধলেশ্বরী পেরিয়ে গোপালপুরে হাঁকডাক, আধা ঘণ্টায় বিক্রি হয় ২০০ মণ দুধ

ছবি: আগামীর সময়
ধলেশ্বরী নদীর খেয়া পার হয়ে তীরের বালুচর ধরে হেঁটে চলছেন ৫৫ বছর বয়সী আবুল হোসেন। তাঁর মাথায় অ্যালুমিনিয়ামের ভারী দুধের কলস। একা আবুল হোসেনই নন, তাঁর পেছনে নদীর পাড় দিয়ে সারিবদ্ধভাবে ছুটে চলছেন একদল মানুষ। কারও মাথায় বড় বড় কলস, কারও হাতে বালতি বা জগভরা টাটকা সাদা দুধ। প্রতিদিন সাতসকালে ধলেশ্বরীর ঘাটগুলোতে যেন দুধের মিছিল নামে। চরের এই গাভী পালনকারীরা দল বেঁধে ছুটে চলেন সাটুরিয়ার ঐতিহ্যবাহী গোপালপুর বাজারের দিকে।
দৌলতপুরের কারকাইদ গ্রামের আবুল হোসেন জানালেন, তাঁদের গ্রামের আশপাশে কোনো বড় বাজার নেই। তাই বাধ্য হয়েই প্রতিদিন নদী পেরিয়ে এই বাজারে আসতে হয়। তবে কষ্ট হলেও এখানে অন্য বাজারের চেয়ে দাম কিছুটা ভালো মেলে, আর পাইকার বেশি থাকায় মুহূর্তের মধ্যে সব দুধ বিক্রি হয়ে যায়।
উপজেলার বরাইদ, রাজৈর, ছনকা, গোপালপুরসহ আশপাশের প্রায় ১০টি গ্রামের মানুষের প্রধান জীবিকাই গাভী পালন। প্রতিদিন ভোরে খামারিরা দুধ সংগ্রহের পর তা নিয়ে ছোটেন গোপালপুর বাজারে। এই বাজারের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর স্থায়িত্ব। প্রতিদিন সকালে মাত্র আধা ঘণ্টার জন্য বসে এই দুধের হাট। আর এই সামান্য সময়ের মধ্যেই চরের খাঁটি দুধ কিনতে রীতিমতো কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। আধা ঘণ্টাতেই হাটে কেনাবেচা হয়ে যায় প্রায় ২০০ থেকে ২৫০ মণ দুধ। শীতের দিনে এই বিক্রির পরিমাণ ৩০০ মণ ছাড়িয়ে যায়। বর্তমানে প্রতি কেজি দুধ বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা দরে।
গোপালপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায় এক তুমুল ব্যস্ততা। বিক্রেতারা বাজারে পৌঁছানো মাত্রই ওত পেতে থাকা পাইকাররা দুধের পাত্রে হাত ডুবিয়ে গুণগত মান ও ঘনত্ব পরখ করছেন। দাম বনিবনা হওয়ামাত্রই হাতবদল হচ্ছে পাত্র। এরপর ডিজিটাল মেশিনে দ্রুত মেপে টাকা বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে খামারিদের। পাইকাররা সেই দুধ বড় বড় ড্রামে ঢেলে ভ্যানগাড়ি কিংবা পিকআপে করে পাঠিয়ে দিচ্ছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
তবে হাটে একচেটিয়া কারবারের অভিযোগও রয়েছে। ছনকা গ্রামের গোপাল রাজবংশী ১০ কেজি দুধ নিয়ে বাজারে এসেছেন। তিনি জানান, অন্য বাজারের চেয়ে এখানে কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা বেশি পাওয়া যায় বলে তাঁর গ্রামেরই প্রায় ৬০ থেকে ৭০ জন খামারি এখানে আসেন। তবে খামারিদের অভিযোগ, পাইকাররা আগে থেকেই সিন্ডিকেট করে প্রতিদিন সকালের দাম নির্ধারণ করে দেন। ফলে অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামেও দুধ ছেড়ে দিতে হয় তাঁদের।
বাজারের নিয়মিত পাইকার মো. রাসেল মিয়া জানান, তিনি একাই প্রতিদিন এই হাট থেকে ৪০ থেকে ৫০ মণ দুধ কেনেন। চরের গরুর দুধের মান খুব ভালো হওয়ায় এর চাহিদাও অনেক। দরগ্রাম থেকে আসা আরেক পাইকার রমেশ ঘোষ গত ১৫ বছর ধরে এই বাজার থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০ মণ করে দুধ কিনছেন।
এই বিশাল কর্মযজ্ঞের অন্যতম প্রধান সারথি রাজৈর খেয়াঘাটের ইঞ্জিনচালিত শ্যালো নৌকার মাঝি সাজাহান মিয়া। গত ৮ বছর ধরে এই ঘাটে মানুষ পারাপার করছেন তিনি। সাজাহান মিয়া বললেন, 'আমার নৌকায় একসঙ্গে ৫০ জন মানুষ ওঠা যায়। প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রায় দুই থেকে আড়াইশ মানুষ দুধের কলস-বালতি নিয়ে নদী পার হয়ে গোপালপুর বাজারে যান। সকালের এই সময়টায় নদীঘাটে পা ফেলার জায়গা থাকে না।'
চরের খামারিদের এই কষ্ট ও দুধের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আশার কথা শোনালেন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তানজিলা ফেরদৌসী। তিনি জানান, গোপালপুর বাজারে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ দুধ বিক্রি হয়, তার সঠিক মূল্য খামারিরা যেন পান, সেজন্য সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একটি বিশেষ প্রকল্পের আওতায় সেখানে ‘ভিলেজ মিল্ক কালেকশন সেন্টার’ বা দুগ্ধ সংগ্রহ কেন্দ্র গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। এর মাধ্যমে সরাসরি দুধ সংগ্রহ করে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন বড় জায়গায় পাঠানো হবে।
তিনি আরও জানান, খামারিদের সুবিধার্থে বর্তমানে গোপালপুর এলাকায় ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প পরিচালনা করা হচ্ছে এবং গাভীর দুধ দোহন সংক্রান্ত সমস্যার জন্য বিনামূল্যে ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে খামারিদের আধুনিক প্রশিক্ষণ ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার কার্যক্রমও অব্যাহত রয়েছে।




