‘ভাগ্যবতী অনেকেই হয়, এমন জীবনসঙ্গী কজন পায়’

ছবি: আগামীর সময়
যেখানে স্বার্থের হিসাব-নিকাশে সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে রঙ হারিয়ে ফেলে। সেখানে জসিম যেন এক অন্য গল্পের নাম। তিনি প্রমাণ করে দিলেন— ভালোবাসা শুধু কথার ফুলঝুরি নয়। শুধু পাশে থাকার প্রতিশ্রুতিও নয়। ভালোবাসা হলো নিঃস্বার্থভাবে নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার এক গভীর মানবিক অনুভূতি।
নিজের শরীরের অঙ্গ দিয়ে স্ত্রীর জীবনের আলো ফিরিয়ে দিতে জসিম যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তা কোনো সাধারণ ত্যাগ নয়, এটা ভালোবাসার এক নিঃশব্দ মহাকাব্য। এখানে নেই কোনো স্বার্থ। নেই দ্বিধা। আছে শুধু প্রিয় মানুষটির মুখে হাসি দেখার এক গভীর আকাঙ্ক্ষা।
এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়— সত্যিকারের ভালোবাসা মানে শুধু সুখের সময় হাত ধরা নয়, বরং দুঃসময়ে নিজের সবটুকু দিয়ে প্রিয় মানুষটিকে আগলে রাখা। তেমনইভাবে অর্ধাঙ্গিনীর পাশে দাঁড়ালেন শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন। তার বাড়ি গোসাইরহাট উপজেলার বসকাঠি গ্রামে।
২০০৭ সালে শুরু হওয়া পথচলায় সন্তান তামিমকে নিয়ে স্বাছন্দ্যে দিন কাটাচ্ছিলেন জসিম উদ্দিন ও মিনারা দম্পতি। কিন্তু ২০২৪ সালের শুরুতেই সেই সুখের আকাশে মেঘ জমে। হঠাৎ ধরা পড়ে মিনারার দুটি কিডনিই বিকল। সঙ্গে টিউমারের জটিলতা। চিকিৎসার বিপুল খরচ আর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ দেখে দিশেহারা হয় পরিবারটি। মিনারার মা কিডনি দিতে চাইলেও অসুস্থতার কারণে তা সম্ভব হয়নি। চারদিকে যখন নিরাশার দেয়াল, তখন ত্রাতা হয়ে এলেন খোদ স্বামী।
নিজের জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও এক মুহূর্ত দ্বিধা করেননি জসিম। চিকিৎসকদের তিনি সাফ জানান, তার একটি কিডনি নিয়ে যেন বাঁচানো হয় তার স্ত্রীকে। গত ৫ মার্চ জসিমের একটি কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় মিনারার শরীরে। অস্ত্রোপচার হয় ঢাকার শ্যামলী সিকেডি হাসপাতালে। তারা এখন সুস্থতার পথে।
জসিমের ভাষ্য, ‘স্ত্রী কখনোই কিডনি চায়নি আমার কাছে। কিন্তু আমি চেয়েছি আমরা যেন একসঙ্গে আমাদের সন্তানকে বড় করতে পারি। আমার সিদ্ধান্তে দ্বিধা ছিল না একটুও।
সুস্থ হয়ে ওঠা মিনারা বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বললেন, ‘তিনি যেন ফিরে পেলেন নতুন জীবন। ভাগ্যবতী হয়তো অনেকেই হয়, কিন্তু এমন জীবনসঙ্গী কজন পায়? তিনি (স্বামী) আমাকে শুধু কিডনি দেননি, দিয়েছেন নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস।’
স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান বি এম নাসির উদ্দিন স্বপনের মতে, এটি কেবল একটি অস্ত্রোপচার নয়, এটি দায়িত্ববোধ ও ত্যাগের এক বিরল উদাহরণ।
নাগরিক সমাজ মনে করেন, শরীয়তপুরের জসিম উদ্দিন আমাদের মনে করিয়ে দিলেন, সত্যিকারের ভালোবাসা সীমাহীন। শরীরের একটি অংশ না থাকলেও জসিমের বুক আজ তৃপ্তিতে ভরা। কারণ তার পাশেই হাসিমুখে আছেন অর্ধাঙ্গিনী।

