পাবনা মানসিক হাসপাতাল
সুস্থ হতে এসে একজন লাশ, খুনের আসামি অন্যজন!

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলার খোঁজাখালি গ্রামের বাসিন্দা বিলকিস খাতুন। সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত স্বামী নাজমুল ইসলামকে (৩০) সুস্থ করার স্বপ্ন নিয়ে গত ২ জুন পাবনা মানসিক হাসপাতালে আসেন। এরপর স্বামীকে ভর্তি করান আবাসিক ওয়ার্ডে।
কিন্তু পরদিনই তার স্বপ্ন ভেঙে যায়। ৩ জুন ভোরে জানতে পারেন, একই ওয়ার্ডের আরেক রোগী ইনজামুল হক (২৮) খুন হয়েছেন। সেই খুনে অভিযুক্ত হয়েছেন তার স্বামী নাজমুল।
হাসপাতাল সূত্র বলছে, গত ২ জুন সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার খোঁজাখালি গ্রামের নাজমুল ইসলাম এবং ঝিনাইদহের রাজনগর গ্রামের ইনজামুল হককে হাসপাতালের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। রাত ৩টার দিকে নাজমুল ও ইনজামুল মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। একপর্যায়ে মাথায় আঘাত পেয়ে মারা যান ইনজামুল। গুরুতর আহত হন নাজমুলও।
সুস্থ হতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে এক রোগীর মৃত্যু ও আরেক রোগীর আসামি হওয়ার ঘটনায় পাবনা মানসিক হাসপাতালের নিরাপত্তা ও চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো। অভিযোগ উঠেছে, নাজমুলকে সঠিক চিকিৎসা না দিয়ে উল্টো নির্যাতন করেছে হাসপাতালের কর্মীরা।
নাজমুলের স্ত্রী বিলকিস খাতুন বলেছেন, ‘পাঁচ বছর ধরে আমার স্বামী অসুস্থ। ইদানীং তার আচরণ আমাদের পক্ষে আর সামলানো সম্ভব হচ্ছিল না। সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়েই তাকে সুস্থ করতে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলাম। এখন সে খুনের আসামি!’
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘আমার স্বামীকে যখন ভর্তি করি, তখন স্পষ্ট বলা হয়েছিল যে তিনি মাঝে মাঝে উত্তেজিত হয়ে মারধর করতে পারেন। সেই অনুযায়ী তাকে হাসপাতালে রাখা হয়েছিল। তারা যদি রোগীকে সামলাতেই না পারেন, তাহলে আমাদের সরাসরি বলতে পারতেন। আমরাই অন্য কোনো ব্যবস্থা নিতাম। কিন্তু তা না করে কেন তার ওপর এমন নির্যাতন করা হলো?’
এদিকে, হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাজমুলকে অভিযুক্ত করে পাবনা সদর থানায় একটি মামলা করেছেন নিহত ইনজামুলের ভাই ইজাজুল হক। তবে ইজাজুলের দাবি, নাজমুল নয়—রোগীর নিরাপত্তায় চরম গাফিলতি ও ব্যর্থতার দায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষেরই।
তিনি বলেছেন, ‘যে ছেলেটা আমার ভাইয়ের সঙ্গে মারামারি করেছে, সেও তো মানসিক রোগী। এমন দুজন রোগীকে তারা কেন একসঙ্গে রাখল? যখন তারা মারামারি করছিল, তখন তারা কেন থামাতে পারল না? তাহলে হাসপাতালে এনে লাভ কী হলো! আমি সেবাকর্মীদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেছে, ভয়ে মারামারি থামাতে যায়নি।’
পাবনা মানসিক হাসপাতালের নার্সিং সুপারিনটেনডেন্ট রেখা আক্তার জানালেন, অনেক সময় রোগীদের দেখে স্বাভাবিক বা সুস্থ মনে হলেও তারা হঠাৎ করেই চরম সহিংস আচরণ শুরু করে। এমন পরিস্থিতিতে একজন বা দুজন নার্সের পক্ষে রোগীকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।
তিনি বলেছেন, ‘দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে হাসপাতালের অনেক নার্স বিভিন্ন সময় রোগীদের মারধরে আহত হয়েছেন। এরপরও তারা ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কখনো পরিস্থিতি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে, একজন রোগীকে নিয়ন্ত্রণে আনতে ১০ জন মিলে হিমশিম খেতে হয়। হাসপাতালে পুরুষ সেবাকর্মীর সংকট রয়েছে। ফলে সদিচ্ছা থাকলেও প্রত্যাশিত সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।’
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিচালক ডা. শাফকাত ওয়াহিদ বলছিলেন, ‘যে রোগীরা মারামারি করেছেন, তারা আগেও হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গভীর রাতে ঘটনাটি ঘটেছে। মৃত্যুর ঘটনাটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। অতি ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের জন্য আমাদের পৃথক আইসোলেশনের ব্যবস্থা নেই। সীমিত জনবল নিয়ে এ ধরনের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. রামদুলাল ভৌমিক মনে করেন, মানসিক হাসপাতালে প্রায়ই রোগী মৃত্যুর ঘটনায় সামগ্রিক সেবা পদ্ধতি নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষায়িত এ হাসপাতালে কর্মরত সেবাকর্মীদের আলাদা প্রশিক্ষণ, ঝুঁকিভাতা এবং সহিংস পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৌশলগত প্রস্তুতি প্রয়োজন।
পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজিনূর রহমান বলেছেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে কাজ করছে পুলিশ। আইনি প্রক্রিয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট রোগীর মানসিক অসুস্থতা এবং ঘটনার পারিপার্শ্বিকতা যাচাই করে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে।’




