চুনারুঘাটে সুবিধাবঞ্চিত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী
স্বীকৃতির বাইরে ৫৮ জাতিগোষ্ঠী

ছবি: শামীম-উস-সালেহীন
পাহাড়, চা বাগান ও সীমান্তঘেরা হবিগঞ্জের চুনারুঘাট বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী, ভাষা ও সংস্কৃতির এক মিলনভূমি। রেমা-কালেঙ্গা, সাতছড়ি পল্লীসহ উপজেলার বিভিন্ন পাহাড়ি ও চা বাগান এলাকায় বসবাস করে ৮৫টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নি জস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার, উৎসব ও জীবনযাপন ধরে রাখা এসব জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাত্র ২৭টি সরকারি তালিকায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃত। বাকি ৫৮টি জাতিগোষ্ঠীর নাম তালিকায় না থাকায় চাকরিতে কোটা, সরকারি অনুদানসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
এই বঞ্চনার বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ঘিরে। দেশের উন্নয়ন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অবদান ও অর্জনের স্বীকৃতি দিতে ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ঘোষণা করে জাতিসংঘ। প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পালিত হয় দিবসটি। চুনারুঘাটের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষও পালন করে দিনটি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, নির্দিষ্ট এলাকায় বসবাস, নিজস্ব ইতিহাস, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য, কারুশিল্প, ধর্মীয় আচার, রীতিনীতি ও প্রথা— ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার নানা উপাদান এসব সম্প্রদায়ের মধ্যে রয়েছে। তবু সরকারি তালিকায় নাম না থাকায় তাদের অনেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃত সুযোগ-সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছেন।
এই বৈষম্যের পেছনে শুধু সরকারি তালিকার সীমাবদ্ধতাই নয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতাও ভূমিকা রাখছে বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিমত। দারিদ্র্য, শিক্ষার সুযোগের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব এবং সংগঠিত নেতৃত্বের সংকটের কারণে এসব সম্প্রদায়ের অনেকে নিজেদের দাবিগুলো কার্যকরভাবে তুলে ধরতে পারছেন না। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সংগঠনগুলোর নেতৃত্বও তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পাশে দাঁড়াচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
এর প্রভাব পড়ছে তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির ওপরও। চুনারুঘাটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সংগীত, নৃত্য ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য সরকারি কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে অনেক নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতির চর্চা কমে যাচ্ছে।
সরকারি উদ্যোগের ঘাটতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় ২০১০ সালের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন নিয়ে কথা বললে। ওই আইনে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে ২৭টি জাতির নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু চুনারুঘাটে বসবাসকারী ৫৮টি সম্প্রদায়ের নাম সেই তালিকায় নেই।
আদিবাসী চা শ্রমিক ফোরামের সভাপতি স্বপন সাঁওতালের ভাষায়, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকায় না থাকায় অধিকাংশ চা শ্রমিক সরকারি বরাদ্দের বিভিন্ন সুবিধা পান না। উপজাতি কোটা থাকলেও স্বীকৃতি না থাকায় তাদের ছেলেমেয়েরা চাকরির ক্ষেত্রে সেই সুবিধা নিতে পারছে না।’
একই দাবি পাহাড়ি এলাকার বাসিন্দাদেরও। আদিবাসী নেতা পলাশ হাজং বলেছেন, ‘পাহাড়ি এলাকার অনেক মানুষ এখনো পাননি স্বীকৃতি। এর ফলে রেমা-কালেঙ্গা এলাকার ছেলেমেয়েরা চাকরির কোটা ও সরকারি বিভিন্ন সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’




