ফেলনা ছোবড়াই বদলে দিচ্ছে বাগেরহাটের শত শত নারীর ভাগ্য

ছবি: আগামীর সময়
একসময় যে নারকেলের ছোবড়া ছিল গৃহস্থালির আবর্জনা কিংবা স্রেফ অবহেলিত ও মূল্যহীন বস্তু, আজ সেই ফেলনা জিনিসই বদলে দিচ্ছে বাগেরহাটের শত শত নারীর ভাগ্য। পরিবেশবান্ধব ও নান্দনিক পণ্য তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় নারীদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে সফলতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছেন নারী উদ্যোক্তা রোজী আহমেদ। তাঁর হাত ধরে বাগেরহাটের মেঠোপথ থেকে তৈরি পণ্য এখন শোভা পাচ্ছে ইউরোপের বাজারে।
বাগেরহাট শহরের বাসাবাটি এলাকায় নিজের বাড়ির একাংশেই রোজী গড়ে তুলেছেন তাঁর ক্ষুদ্র কারখানা ‘মেসার্স অর্গানিক প্রডাক্ট’। সেখানে কাঠ, বাঁশ, কাপড়ের টুকরো, তুলা, সুতা আর মূলত নারকেলের ছোবড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে ১৩ ধরনের পাখির বাসা, কোকোপোল, মালচিং ম্যাট, ফ্লাওয়ার বাস্কেট, থালা-বাসন মাজুনি, কুকুরের ঘর, বিড়ালের বাসা ও খেলনা, স্লিপার, সফট টয়, উডেন টুল, উইন্টার শিট এবং বেবি ভাউচারসহ প্রায় ৪০ ধরনের শৌখিন ও পরিবেশবান্ধব পণ্য। দেশীয় বাজারের গণ্ডি পেরিয়ে এসব পণ্যের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। বর্তমানে তাঁর কারখানার উৎপাদিত পণ্য নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে বেলজিয়াম, জার্মানি ও গ্রিসে।
রোজী আহমেদের এই কারখানায় প্রতিদিন কাজ করছেন ৫০ থেকে ৬০ জন নারী। গৃহবধূ থেকে শুরু করে কলেজপড়ুয়া তরুণী—সবাই এখন এখানে কাজ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী। কারখানায় গিয়ে দেখা যায় এক উৎসবমুখর কর্মব্যস্ততা। তিনতলা ভবনের নিচতলা আর পাশের টিনশেড কক্ষে নারীরা কেউ ছোবড়া কেটে নির্দিষ্ট আকার দিচ্ছেন, কেউ সুঁই-সুতা দিয়ে সেলাই করছেন, আবার কেউ ব্যস্ত রঙ আর নকশার কাজে। তাঁদের দক্ষ হাতের ছোঁয়াতেই তৈরি হচ্ছে আন্তর্জাতিক মানের সব পণ্য।
উদ্যোক্তা রোজী আহমেদ তাঁর এই জার্নি সম্পর্কে জানান, ২০১৯ সালে তিনি প্রথম নারকেলের ছোবড়া দিয়ে কোকোপোল, মালচিং ম্যাট, হ্যাঙ্গিং বাস্কেট ও ফ্লাওয়ার পট বানিয়ে বাজারজাত করা শুরু করেন। এরপর করোনাকালে যখন চারদিকে কর্মসংস্থান কমে যায়, তখন এলাকার নারীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি বাড়িতেই বড় পরিসরে উৎপাদন শুরু করেন। রোজী বলেন, “শুরুতে মাত্র ১০ থেকে ১২ জন নারীকে কাজ শিখিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলাম। পরে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে এক হাজার পিস পাখির বাসার অর্ডার পাই। আমার করা ডিজাইনটি তাদের পছন্দ হওয়ায় আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।”
এই কারখানাটি কীভাবে স্থানীয় নারীদের জীবনে অর্থনৈতিক মুক্তির আলো এনেছে, তা বোঝা যায় কর্মীদের সাথে কথা বললে। কারখানার কর্মী শাফালি বেগম বললেন, 'আমার স্বামী দিনমজুর, তাঁর একার আয়ে সংসার চালানো খুব কষ্টের ছিল। এখন এই কারখানায় কাজ করে যে বেতন পাই, তা দিয়ে সংসারের খরচে সাহায্য করি। ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার খরচ, বই-খাতা আর স্কুলের বেতনও এখন নিজের আয় থেকে দিই। আমার উপার্জন থাকায় পরিবারের আর্থিক চাপ অনেক কমেছে।'
একই রকম অভিজ্ঞতার কথা জানালেন মরিয়ম আক্তার ও রুবিনা বেগম। আগে সংসারের খরচের জন্য তাঁদের পুরোপুরি স্বামীর ওপর নির্ভর করতে হতো, এখন নিজেরা আয় করায় পরিবারে স্বচ্ছলতা আসার পাশাপাশি তাঁদের নিজেদের আত্মবিশ্বাসও অনেক বেড়েছে। এমনকি কলেজ শিক্ষার্থী তানিয়া খাতুনও পড়াশোনার পাশাপাশি এখানে খণ্ডকালীন কাজ করে নিজের খরচ নিজে চালাচ্ছেন এবং নতুন কাজ শিখছেন।
ব্যবসায়িক এই অনন্য সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আয়োজিত ‘এসএমই নারী উদ্যোক্তা মেলা’য় বিশেষ সম্মাননা পেয়েছেন রোজী আহমেদ। তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি কিছু সংকটের কথাও জানান এই সফল উদ্যোক্তা। তিনি জানালেন, 'স্থানীয়ভাবে নারকেলের উৎপাদন কমে যাওয়ায় বর্তমানে আমাদের ভারত থেকে নারকেলের ছোবড়া আমদানি করতে হচ্ছে। সরকারি সহযোগিতা, সহজ শর্তে ঋণ এবং রপ্তানি সহায়তা পেলে কারখানাটি আরও বড় করা সম্ভব। এতে যেমন নারীদের কর্মসংস্থান বাড়বে, তেমনি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও বড় ভূমিকা রাখা যাবে।'
বাগেরহাট বিসিক শিল্পনগরীর কর্মকর্তা শরীফ সরদার এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করেন। তার ভাষ্য, 'উদ্যোক্তা রোজী আহমেদের এই প্রতিষ্ঠানটি শুধু একটি ব্যবসা নয়, এটি স্থানীয় নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি সফল মডেল। নারকেলের ছোবড়ার মতো অবহেলিত উপকরণ ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানি করা অত্যন্ত ইতিবাচক। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিও সমৃদ্ধ হচ্ছে। বিসিক সবসময় এই ধরনের সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।'
ইচ্ছাশক্তি, সৃজনশীল চিন্তা আর কঠোর পরিশ্রম থাকলে যে একদম ফেলনা জিনিস দিয়েও বিশ্বজয়ের গল্প লেখা যায়—বাগেরহাটের রোজী আহমেদ ও তাঁর কারখানার নারীরা আজ তা-ই প্রমাণ করে দেখিয়েছেন।




