নড়বড়ে বাঁধে প্লাবনের ভয়

ফাইল ছবি
ভারী বৃষ্টি শুরু হলেই রাতের ঘুম উধাও হয়ে যায় মো. মাসুমের। আকাশে মেঘ জমতে দেখলেই ফিরে আসে গত দুই বছরের দুঃসহ স্মৃতি। ফেনীর পরশুরাম উপজেলার চিথলীয়া ইউনিয়নের অলকা গ্রামের বাসিন্দা তিনি। চট্টগ্রামের একটি মসজিদে ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কর্মস্থলে থাকলেও মন পড়ে থাকে নদীপাড়ের বাড়িতে। কারণ, মুহুরী নদীর পাড়ে থাকা সেই বাড়ি দুই দফা বিপর্যস্ত হয়েছে বন্যায়।
স্মৃতির সেই ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে মাসুম বললেন, ‘২০২৪ সালের ভয়াবহ বন্যার ক্ষতি সামলে নতুন করে ঘর তুলেছিলাম। কিন্তু ২০২৫ সালের জুলাইয়ে আকস্মিক বন্যায় ভেসে যায় সেই ঘরও। গভীর রাতে হঠাৎ পানি ঢুকে লণ্ডভণ্ড করে দেয় সবকিছু। মা, ভাই, স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে প্রতিবেশীর বাড়িতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল।’
মাসুমের মতো এমন অভিজ্ঞতা এখন মুহুরী নদীপাড়ের বহু মানুষের। আর সে কারণেই বাঁধের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত দুই বছরের বন্যার পর মুহুরী নদীর কিছু অংশের বাঁধ সংস্কার হলেও বড় একটি অংশ এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। পরশুরামের নোয়াপুর পশ্চিমপাড়ার আলতাফ আলী মসজিদের পশ্চিম থেকে দক্ষিণ পাশ পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার এবং পশ্চিম অলকার বাংলা হুজুরের বাড়ি থেকে জঙ্গলঘোনা সেতুর গোড়া পর্যন্ত আরও প্রায় আধা কিলোমিটার বাঁধের কাজ অসম্পূর্ণ রয়েছে। ফলে ভারী বৃষ্টিতেই দেখা দেয় প্লাবনের শঙ্কা।
তবে ঝুঁকি শুধু পরশুরামেই সীমাবদ্ধ নয়। একই ধরনের উদ্বেগ রয়েছে ফুলগাজী উপজেলার বিভিন্ন এলাকাতেও। দক্ষিণ দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রশিদ চৌধুরীর ভাষ্য, উত্তর দৌলতপুর নাপিতকোনা, উত্তর দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকা, শালধর দেরপাড়া ও উত্তর বরৈয়া বণিকপাড়াসহ বিভিন্ন স্থানে এখনো পুরোপুরি মেরামত হয়নি বাঁধ। উজানে ভারী বর্ষণ হলে আবারও ভয়াবহ বন্যার মুখে পড়তে হবে বলে শঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
আর এ আশঙ্কার বাস্তবতা টের পাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষও। পরশুরাম উপজেলার চিথলীয়া ইউনিয়নের ধনিকুণ্ডা এলাকার বাসিন্দা শ্যামল চন্দ্র দাসের বাড়ির পাশ দিয়েই গেছে মুহুরী নদীর বাঁধ। তিনি জানিয়েছেন, গত বছর বাঁধ সংস্কার করা হলেও এখন সেটি আবার নড়বড়ে হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন স্থানে দেখা দিয়েছে ফাটল। বৃষ্টি শুরু হলেই উৎকণ্ঠা বাড়ে। রাতে ভারী বর্ষণ হলে আর ঘুম আসে না।
গত সোমবার সকাল থেকে ফেনী, ফুলগাজী ও পরশুরাম উপজেলায় থেমে থেমে হালকা, মাঝারি এবং কখনো ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, এদিন ফেনীতে বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয় ৫৩ মিলিমিটার।
বৃষ্টির সঙ্গে নদীর পানিও বাড়তে শুরু করায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে বন্যার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে সরকারি দপ্তরের ভাষ্য কিছুটা ভিন্ন। পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেনী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মনিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘মুহুরী ও সিলোনীয়া নদীর পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপৎসীমার চার সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে। এখনই বন্যার আশঙ্কা নেই। বাঁধের দুর্বল অংশগুলো মেরামত করা হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে। পাশাপাশি মুহুরী, কহুয়া ও সিলোনীয়া নদীর টেকসই বাঁধ নির্মাণে সম্প্রতি একনেক সভায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। চলতি বছরের শেষ নাগাদ কাজ শুরু হওয়ার কথা। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ফেনীর বিস্তীর্ণ এলাকা বন্যার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই সুরক্ষা পাবে।




