নিভৃত বাংলার কুঠিবাড়িতে রবি-স্মরণ: মানুষ ও প্রকৃতির মেলবন্ধনে তিন দিনের উৎসব
- ১৬৫তম জন্মজয়ন্তীর বর্ণাঢ্য সূচনা
- পদ্মার ঢেউয়ে যেন আজও বাজে কবির ধ্বনি

ছবি: আগামীর সময়
১৮৯১ সালের সেই ধূসর দিনগুলোতে জমিদারী তদারকির প্রয়োজনে যে তরুণ কবি কুষ্টিয়ার শিলাইদহে পা রেখেছিলেন, আজ দেড় শতাব্দী পেরিয়েও তার অস্তিত্ব এই মাটির ঘাসে ঘাসে মিশে আছে। ২৫ শে বৈশাখ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬৫তম জন্মোৎসব। এ উপলক্ষে কবির প্রিয় স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার শিলাইদহ কুঠিবাড়িতে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা। আজ শুক্রবার বিকালে কুঠিবাড়ির সেই ঐতিহাসিক উন্মুক্ত মঞ্চে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
অনুষ্ঠানের মূল আকর্ষণ ছিল স্মারক বক্তা অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদের আবেগময় আলোচনা। তিনি বলেছেন, রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টির কেন্দ্রে আছে মানুষ ও প্রকৃতি। তার ভাবনা কেবল নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা বিশ্বজনীন। এই শিলাইদহের নিভৃত প্রান্তরে বসেই তিনি বিশ্বপ্রকৃতির সঙ্গে নিজের আত্মাকে মিলিয়েছিলেন। যার ফলে তিনি হয়ে উঠেছেন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বিশ্বকবি।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া-১ আসনের সংসদ সদস্য রেজা আহমেদ বাচ্চু মোল্লা, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সংসদ সদস্য আফজাল হোসেন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন এবং বিএনপির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক ও জাসাস কেন্দ্রীয় কমিটির আহবায়ক হেলাল খান। স্বাগত বক্তব্যে জেলা প্রশাসক তৌহিদ-বিন-হাসান উৎসবের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী রবীন্দ্র-অনুরাগীদের জন্য এক আশার বাণী শুনিয়েছেন। তিনি জানান, রবীন্দ্র কুঠিবাড়ীকে একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে সরকার। এ লক্ষ্যে সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যৌথ আলাপ-আলোচনা চলছে।
তিনি আরও জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাধীন ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে দর্শনার্থীদের জন্য আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর।
জাতীয় সংগীতের সমবেত সুরের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। এরপর বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির শিল্পীদের কণ্ঠে রবীন্দ্রসংগীত, কবিতা আবৃত্তি ও মনোজ্ঞ নৃত্যানুষ্ঠান দর্শকদের বিমোহিত করে।
গ্রামীণ মেলার অনুমতি না মিললেও রবীন্দ্রপ্রেমীদের ভিড়ে কুঠিবাড়ি প্রাঙ্গণ ছিল মুখরিত। তিল ধারণের ঠাঁই নেই। দূর-দূরান্ত থেকে আসা কবিভক্তদের চোখেমুখে ছিল প্রবল উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রশাসন থেকেও এই জনসমুদ্র সামলাতে এবং উৎসব নির্বিঘ্ন করতে কয়েক স্তরের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
এই শিলাইদহ কুঠিবাড়ি কেবল একটি দালান নয়। এটি বিশ্ব সাহিত্যের এক পবিত্র তীর্থস্থান। এখানে বসেই কবি তার কালজয়ী গীতাঞ্জলির ইংরেজি অনুবাদ করেছিলেন। যা তাকে এনে দিয়েছিল নোবেল পুরস্কার। চিত্রা, চৈতালী, নৈবেদ্য থেকে শুরু করে অসংখ্য ছোটগল্প আর 'ছিন্নপত্রাবলীর’ পাতায় পাতায় অমর হয়ে আছে এই শিলাইদহের নিসর্গ। আজও সেই বকুলতলা আর পদ্মার শান্ত স্রোত সাক্ষী হয়ে আছে কবির সেই দিনগুলোর, যখন তিনি নিভৃত বাংলায় বসে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন বুনেছিলেন।
তিন দিনের এই উৎসব কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং কবির ভাবাদর্শে নতুন প্রজন্মকে উজ্জীবিত করার এক অনন্য প্রয়াস।






