মোরেলগঞ্জে জিপিএফের ১০ কোটি টাকা জালিয়াতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কার্যালয়ে অভিযোগ উঠেছে জেনারেল প্রভিডেন্ট ফান্ডের (জিপিএফ) প্রায় ১০ কোটি টাকা জালিয়াতির। এ ঘটনায় চার সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও দুই অডিটরসহ ছয় কর্মকর্তা-কর্মচারীকে করা হয়েছে সাময়িক বরখাস্ত। প্রাথমিকভাবে তদন্তে ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১২ হাজার ২০০ টাকা সরকারি তহবিল জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে।
গত মঙ্গলবার হিসাব মহাপরিদর্শক এস এম রেজভী ও বুধবার বাংলাদেশের কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল মো. নুরুল ইসলামের সই করা আলাদা প্রজ্ঞাপন ও অফিস আদেশে নিশ্চিত করা হয়েছে এ তথ্য।
সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৩৯ ধারার উপধারা (১) অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয় অফিস আদেশে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্তরা নিজ নিজ ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অনলাইন ব্যবস্থায় জিপিএফ অগ্রিম বিলের বিপরীতে তৈরি ও অনুমোদন করেন ভুয়া বিল। এর মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তাদের বিরুদ্ধে।
চার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ: বরখাস্ত হওয়া চার সাবেক উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে মীর এনামুল হকের বিরুদ্ধে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৪ কোটি ৩২ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টাকা জালিয়াতি করেছেন তিনি। জালিয়াতির বিষয়টি উদ্ঘাটনের সময় তিনি কর্মরত ছিলেন রামপাল উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে।
সৌমেন সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ১৭ লাখ ৯২ হাজার টাকা জালিয়াতির। তিনি বর্তমানে খুলনার তেরখাদা উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত।
মদন কুমার দাসের বিরুদ্ধে ১২ লাখ ৮৬ হাজার এবং হাসানুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে ৮ লাখ ৮০ হাজার টাকা জালিয়াতির।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মদন কুমার দাস বর্তমানে বাগেরহাটের ডিস্ট্রিক্ট অ্যাকাউন্টস অ্যান্ড ফিন্যান্স অফিসার (ডিএফএও) কার্যালয়ে কর্মরত। খুলনা বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস কার্যালয়ে অডিট অ্যান্ড অ্যাকাউন্টস অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন হাসানুজ্জামান।
দুই অডিটরের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল তৈরির অভিযোগ: তদন্তে অডিটর শ্যামল কুমার দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে ৬৫টি ভুয়া বিল তৈরির। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত এসব বিল তৈরি করা হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।
এসব বিলের মাধ্যমে ৪ কোটি ৮১ লাখ ৯৬ হাজার ৬০০ টাকা জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। জালিয়াতির বিষয়টি উদ্ঘাটনের সময় বাগেরহাটের মোংলায় কর্মরত ছিলেন তিনি।
অন্যদিকে অডিটর রুবেল মোল্লার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে ১২টি ভুয়া বিল তৈরির। ২০২২-২৩ অর্থবছরে এসব বিলের মাধ্যমে ২৩ লাখ ২১ হাজার ২০০ টাকা জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ওই সময় বাগেরহাটের শরণখোলায় কর্মরত ছিলেন তিনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে ছয়জনের বিরুদ্ধে মোট ৯ কোটি ৭৭ লাখ ১২ হাজার ২০০ টাকা সরকারি তহবিল জালিয়াতির অভিযোগ আনা হয়েছে।
শিক্ষকদের হিসাবের গরমিল থেকে তদন্ত: জানা গেছে, জিপিএফ হিসাবের সঠিকতা যাচাই করতে গিয়ে গরমিল দেখতে পান কয়েকজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। জিপিএফ থেকে ঋণ নিতে গিয়ে তাদের নজরে আসে বিষয়টি।
কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেন, তাদের জিপিএফ হিসাবের অর্থ নিয়ে এ ধরনের লেনদেনের বিষয়ে আগে কিছুই জানতেন না তারা। হিসাব যাচাইয়ের সময় কোনো কোনো শিক্ষকের হিসাবে একই দিনে বড় অঙ্কের টাকা জমা ও উত্তোলনের তথ্য পাওয়া যায় বলেও দাবি তাদের।
পরে জিপিএফ হিসাব যাচাইয়ের জন্য খুলনার বিভাগীয় কন্ট্রোলার অব অ্যাকাউন্টস (ডিসিএ) কার্যালয়ে চিঠি দেন মোরেলগঞ্জ উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা তন্ময় গোস্বামী। এর পরিপ্রেক্ষিতে গঠন করা হয় একটি বিশেষ তদন্ত কমিটি।
কমিটির তদন্তে সাবেক চার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও দুই অডিটরের বিরুদ্ধে সরকারি অর্থ জালিয়াতির অভিযোগের তথ্য উঠে আসে। এ বিষয়ে খুলনা ডিডিসিএ তামান্না ইসলামের বক্তব্য জানতে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন ধরেননি তিনি।
সংশ্লিষ্ট অফিস আদেশে বলা হয়, সাময়িক বরখাস্ত থাকা অবস্থায় প্রচলিত বিধি অনুযায়ী খোরাকি ভাতা পাবেন অভিযুক্তরা। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া তারা কেউ কর্মস্থল বা নির্ধারিত স্টেশন ত্যাগ করতে পারবেন না। তদন্তের প্রয়োজনে যেকোনো সময় উপস্থিত হতে হবে তাদের।



