ইতিহাসে অমর ফিরোজ-সখিনার প্রেম, সরকারি উপেক্ষায় অবহেলিত সমাধি

ছবি: আগামীর সময়
ময়মনসিংহের গৌরীপুর পৌর শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার পূর্ব-উত্তর দিকে এগোলেই মাওহা ইউনিয়নের কুমড়ি গ্রাম। সপ্তদশ শতকে এই জনপদের নাম ছিল কেল্লা তাজপুর। প্রকৃতির শান্ত সান্নিধ্যে এই গ্রামেই এক প্রাচীন সমাধি জানান দিচ্ছে এক বীরাঙ্গনার বীরত্ব আর অমর প্রেমের করুণ উপাখ্যান। এটি সপ্তদশ শতকের মোগল দেওয়ান উমর খাঁর কন্যা সখিনা বিবির সমাধি, যা স্থানীয় মানুষের কাছে ‘সখিনা বিবির মাজার’ নামে পরিচিত। ১০০০ শতাব্দীর (১৭০০ শতকের) এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আজ পর্যটন শিল্পের এক অপার সম্ভাবনার দুয়ার হতে পারত, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা আর সংরক্ষণের অভাবে এটি আজও অবহেলিত।
জমিদার কন্যা সখিনার বীরাঙ্গনা হয়ে ওঠার ইতিহাস যেমন চমকপ্রদ, তেমনই হৃদয়বিদারক। লোকইতিহাস অনুযায়ী, রূপ ও গুণে অনন্য সখিনার খ্যাতি পৌঁছে গিয়েছিল কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ির শাসক, ঈশা খাঁর দৌহিত্র ফিরোজ খাঁর কাছে। কৌশলে সখিনার কাছে নিজের পরিচয় পাঠিয়ে ফিরোজ তাঁর মন জয় করেন এবং পরে বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। কিন্তু সখিনার পিতা দেওয়ান উমর খাঁ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ভালোবাসার টানে ফিরোজ কেল্লা তাজপুরে আক্রমণ চালিয়ে সখিনাকে বিয়ে করেন।
কিন্তু নাটকের শেষ এখানেই ছিল না। উমর খাঁ পরবর্তীতে ফিরোজকে বন্দি করলে স্বামীকে মুক্ত করতে সখিনা নিজেই অস্ত্র তুলে নেন। পুরুষ যোদ্ধার ছদ্মবেশে তিনি যুদ্ধক্ষেত্রে নামেন এবং বীরত্বের সাথে যুদ্ধ জয় করতে যাচ্ছিলেন। মেয়ের এমন রণরূপ দেখে উমর খাঁ কৌশল খাটান। যুদ্ধক্ষেত্রে সখিনাকে দুর্বল করতে তিনি ফিরোজের নামে একটি মিথ্যা তালাকের খবর ছড়িয়ে দেন। স্বামীর বিচ্ছেদের এই মিথ্যা সংবাদে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন সখিনা এবং যুদ্ধক্ষেত্রেই প্রাণ হারান। পরে যখন তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায়, তখন পিতা উমর খাঁ শোকে কাতর হয়ে পড়েন এবং ফিরোজকে মুক্তি দেন। কথিত আছে, এরপর ফিরোজ খাঁ দরবেশের বেশ ধারণ করে জীবনের বাকি দিনগুলোতে প্রতিদিন সখিনার সমাধিতে প্রদীপ জ্বালাতেন।
দীর্ঘকাল ধরে বীরাঙ্গনা সখিনার এই ঐতিহাসিক সমাধিটি ছিল সম্পূর্ণ অরক্ষিত। সমাধির পাশে কেবল কয়েকটি দুর্লভ প্রজাতির কাঠগোলাপ গাছ দাঁড়িয়ে ছিল এই মহত্ত্বের নীরব সাক্ষী হয়ে। তবে এই অঞ্চলের কবিয়াল ও সাধারণ মানুষের মুখে মুখে ফিরোজ-সখিনার এই অমর কাহিনি বেঁচে ছিল। পরবর্তীতে নব্বইয়ের দশকে স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম এই সমাধিটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নেন।
এরপর ২০০৯ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম আহসানুল হক প্রথম এই সমাধিটি পরিদর্শন করেন। সে সময় স্থানীয় মাওহা ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে সমাধির চারপাশে একটি সীমানা প্রাচীর এবং পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি গেট নির্মাণ করা হয়। তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব ইফতেখার আহমেদ এবং আনন্দ মোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক কাজী আব্দুল মোনায়েমের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে, প্রাবন্ধিক রণজিৎ করের গ্রন্থনায় ফিরোজ-সখিনার এই প্রেম ও বীরত্বের কাহিনি পাথরের ফলকে খোদাই করে দেওয়া হয়। কিন্তু এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটি আজও রাষ্ট্রীয়ভাবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পায়নি।
কুমড়ি গ্রামের বাসিন্দা এমদাদুল হক মিলন আক্ষেপ করে বললেন, 'দীর্ঘদিন ধরে আমাদের একটাই দাবি—বীরাঙ্গনা সখিনার এই সমাধিটিকে কেন্দ্র করে পর্যটনশিল্প গড়ে তোলা হোক।' স্থানীয়রা মনে করেন, সরকারি উদ্যোগে এখানে পর্যটন কেন্দ্র হলে অবহেলিত গৌরীপুর পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক চেহারা পুরোপুরি বদলে যেতে পারে।
গৌরীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আফিয়া আমীন পাপ্পা জানালেন, 'বীরাঙ্গনা সখিনার সমাধিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন। এটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে অনেক আগেই ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত ওপর থেকে কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি।'
ইতিহাসের পাতায় বীরাঙ্গনা সখিনা অমর হয়ে থাকলেও, রাষ্ট্রীয় উদাসীনতায় কুমড়ি গ্রামের এই ঐতিহাসিক স্থানটি আজও পর্যটকদের চেনা আঙিনা হয়ে উঠতে পারেনি। এলাকার মানুষের প্রত্যাশা, দ্রুতই কাটবে এই অবহেলা, আর ইতিহাসের এই গৌরবময় অধ্যায়টি পাবে তার যোগ্য মর্যাদা।




