বেতনহীন ভ্যাকসিন যোদ্ধাদের মানবেতর জীবন

ছবি: আগামীর সময়
বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলায় শিশুদের জীবন রক্ষাকারী ভ্যাকসিন প্রতিটি কেন্দ্রে পৌঁছে দিলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটেনি এর বাহক বা পোর্টারদের। রোদ, বৃষ্টি আর ঝড় মাথায় নিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করা তিন পোর্টার সুশীল চন্দ্র মিস্ত্রি, প্রশান্ত কুমার ও আনোয়ার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে বেতন না পেয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কাগজে তাদের পরিচয় পোর্টার হলেও বাস্তবে তারা পুরো টিকাদান কর্মসূচির প্রাণ। সুশীল ও প্রশান্তের বেতন গত ৯ মাস ধরে বকেয়া রয়েছে, বর্তমানে যার পরিমাণ মাসে ১৬ হাজার ৮০০ টাকা। অন্যদিকে সবচেয়ে শোচনীয় অবস্থায় আছেন আনোয়ার হোসেন, ২০ মাস ধরে এক টাকাও পারিশ্রমিক পাননি তিনি। পাথরঘাটার সাতটি ইউনিয়নের ১৭৮টি টিকাদান কেন্দ্রে নিয়মিত আইসবক্স কাঁধে করে ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়া এই কর্মীরা উৎসবের বোনাস কিংবা বৈশাখী ভাতা থেকেও বঞ্চিত।
দীর্ঘ ২৭ বছর ধরে মাস্টাররোলে কাজ করা সুশীল চন্দ্র মিস্ত্রি তার যাপিত জীবনের কষ্ট তুলে ধরে আক্ষেপের সাথে বললেন, অনিয়মিত ও অল্প বেতনের কারণে সন্তানদের ভালো স্কুলে পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি। দীর্ঘদিন বেতন না পাওয়ায় এখন ঋণ করে চলতে হচ্ছে। উপজেলা সদর থেকে ২০ কিলোমিটার দূরের দুর্গম ইউনিয়নগুলোতে আইসবক্স করে ভ্যাকসিন দিয়ে আসতে হয়। এত কষ্টের পরও প্রাপ্য মজুরি পাই না।
১৯৮৯ সালে মাত্র ৯৬০ টাকা বেতনে চাকরি শুরু করা সুশীলের এই দীর্ঘ কর্মজীবনেও চাকরি স্থায়ীকরণ হয়নি। নামমাত্র মজুরি আর দীর্ঘ বকেয়ার কারণে এই ভ্যাকসিন যোদ্ধাদের অনেক সময় হোটেলে বসে একবেলা ভাত খাওয়ার সামর্থ্যও থাকে না।
পাথরঘাটার প্রবীণ সাংবাদিক মির্জা শহিদুল ইসলাম খালেদ বললেন, ২৭ বছর ধরে মাস্টাররোলে কাজ করলেও সুশীলের চাকরি স্থায়ী হয়নি, অথচ তার অবসরে যাওয়ার সময় হয়েছে। অন্যদিকে ২০ মাস বেতন না পেয়েও আনোয়ার হোসেন প্রতিদিন মানবিক দায়িত্ব থেকে কাঁধে ভ্যাকসিন নিয়ে দায়িত্ব পালন করছেন।
জেলায় কর্মরত ১৮ জন পোর্টারের সবার অবস্থাই প্রায় একই রকম বলে জানান সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) জেলা সুপারভাইজার মো. আলমগীর হোসেন।
পোর্টারদের অবদানের কথা স্বীকার করে বরগুনার সিভিল সার্জন ডা. আবুল ফাত্তাহ জানান, পোর্টাররাই মূলত পুরো টিকাদান কর্মসূচিকে সচল রেখে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তাদের নিরলস পরিশ্রমের কারণেই দুর্গম এলাকায় সময়মতো ভ্যাকসিন পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। তার মতে, বর্তমান সময়ে পোর্টারদের যে বেতন ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া হচ্ছে তা বাস্তবতার তুলনায় অত্যন্ত অমানবিক। এই সংকটের বিষয়ে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রীকে অবহিত করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
শিশুদের হাসি নিশ্চিত করা এই কর্মীদের মুখে হাসি ফোটাতে রাষ্ট্র কবে উদ্যোগী হবে, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।



