ফের ভাঙল খোয়াই বাঁধ, প্লাবিত কয়েক গ্রাম

ছবি: আগামীর সময়
কাটেনি ২০ গ্রামের ৭ হাজার পরিবারের বন্যার ক্ষত। এর মধ্যেই দেড় মাসের ব্যবধানে ফের ভেঙেছে হবিগঞ্জের কালীগঞ্জ এলাকায় খোয়াই নদীর বাঁধ।
আজ রবিবার সকালে নতুন করে প্লাবিত হয়েছে গ্রামের পর গ্রাম। ঘরবাড়িতে পানি, ডুবে গেছে উঠান-রাস্তাঘাট। গবাদিপশু ও ঘরের মালপত্র নিয়ে ভিটেমাটি ছাড়ছেন নারী-পুরুষ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অবাধে বালু-মাটি উত্তোলনে গত কয়েক বছরে খোয়াই নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কমেছে নদীর পানি ধারণক্ষমতা। ফলে আগের তুলনায় কম পানি হলেও নদী ফুলে উঠছে এবং বাড়ছে বাঁধ ভাঙনের ঝুঁঁকি।
গত ৯ জুলাই রাতে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে উঠে কালীগঞ্জ এলাকায় প্রায় ১০০ ফুট বাঁধ ভেঙে যায়। ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধের মেরামতকাজ চলছিল। কাজের ৫০ শতাংশও শেষ হয়নি, এর মধ্যেই রবিবার ফের ভেঙে গেল বাঁধটি।
দুপুরের মধ্যে হবিগঞ্জ সদর উপজেলার লস্করপুর ও বাহুবল উপজেলার মিরপুর ইউনিয়নের অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়। নোয়াবাদ, চরহামুয়া, আদ্যপাশা, বনগাঁও, কালীগঞ্জ, সুঘর ও কটিয়াদিসহ আশপাশের গ্রামগুলোতে পানি ঢুকে পড়ে। অনেকে গবাদিপশু নিয়ে বাঁধের ওপর ও উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন।
লস্করপুর ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সাহেব আলী বলেন, আগের বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িগুলোর মেরামতকাজই শেষ হয়নি। বেশির ভাগ মানুষই শ্রমজীবী। আবার বন্যায় ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তাদের ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।
হবিগঞ্জ সাংবাদিক ফোরামের সাবেক সভাপতি মর্তুজা ইমতিয়াজের শ্বশুরবাড়িও কালীগঞ্জে। তার পরিবারের সদস্যরা গবাদিপশু নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। ঘরে পানি ঢুকে আসবাবপত্র, ফ্রিজ, টেলিভিশনসহ প্রয়োজনীয় মালপত্র নষ্ট হয়েছে। তার ভাষায়, ‘প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারেরই প্রায় একই অবস্থা।’
‘আগের পানিতে হাত-পা অবশ পোলাডারে লইয়া ইউনিয়ন পরিষদের বারান্দায় এক সপ্তাহ কাটাইছি। খাওন-দাওন নাই। অহন আবার ভিটাবাড়ি বানের পানিতে ভাসতাছে। ক্যামনে কী করমু, বুইঝ্যা উঠতাছি না। ও আল্লাহ, তুমি আমরারে দেখবায়নি!’
কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন ৮০ বছরের সৈয়দা বানু। প্যারালাইজড ছেলে আব্দুল আজিজকে (৪০) নিয়ে তিনি এখন অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন। দুপুরে হঠাৎ পানি ঢুকে পড়লে স্থানীয়দের সহায়তায় ছেলেকে নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে ওঠেন তিনি। বৃদ্ধ স্বামী উদ্দত আলী ঘরের মালপত্র একে একে সরিয়ে উঁচু স্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সৈয়দা বানুর মতো মস্তুরা বেগম, আরজত আলী ও আরব আলীসহ অন্তত ১০টি পরিবার অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের কেউ ঘর থেকে মালপত্র বের করার সুযোগ পাননি। শিশুদের নিয়ে নারীরা আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছেন; আর পুরুষরা কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে ঘরের মালপত্র রক্ষার চেষ্টা করছেন। দেড় মাসের ব্যবধানে দ্বিতীয় দফার বন্যায় দিশেহারা তারা।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে ভারতের পাহাড়ি ঢলে খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ২৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছিল। তখন হবিগঞ্জ এলাকায় বাঁধ ভাঙেনি। এবার পানি বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ওপর উঠতেই বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) হবিগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী হারুন বলেন, অবাধে বালু ও মাটি উত্তোলনে নদীর তলদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে পানি ধারণক্ষমতা কমেছে। ফলে আগের তুলনায় ১৫২ সেন্টিমিটার কম পানি হলেও নদী ফুলে-ফেঁপে ওঠে এবং শহররক্ষা বাঁধ ভেঙে যাচ্ছে।
হবিগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সায়েদুর রহমান বলেন, ৮০ লাখ টাকা ব্যয়ে বাঁধের মেরামতকাজ চলছিল। গত কয়েক দিনে ভারতের ত্রিপুরায় ব্যাপক বৃষ্টিপাত ও কপাট খুলে দেওয়ায় খোয়াই নদীর পানি বিপৎসীমার ১৩০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এরই মধ্যে মেরামতাধীন অংশটি ফের ভেঙে গেছে। পানি কমলে আবার মেরামতকাজ শুরু হবে। ঠিকাদারকে একই অর্থে দ্বিতীয়বার কাজ করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন বন্ধ করা ছাড়া খোয়াই নদীর বাঁধভাঙন রোধ কঠিন। এ বিষয়ে সবাইকে সচেতন হতে হবে।’







