‘লাউয়ের দাম ১-২ টাকা, হামেরা কেন-গো বাঁচিমো’

লাউ চাষ করে লোকসানের গল্প শোনালেন চাষি হাসিনুর রহমান। ছবি: আগামীর সময়
ধারদেনা করে ১০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন পঞ্চগড়ের আটোয়ারীর চাষি হাসিনুর রহমান। হয়েছে ভালো ফলনও। কিন্তু ক্ষেত থেকে প্রতি পিস লাউ বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১ থেকে ২ টাকায়। অথচ খুচরা বাজারে সেই লাউয়ের দাম ২০ থেকে ৩০ টাকা।
উৎপাদন খরচও তুলতে না পেরে লোকসান গুনছেন আটোয়ারীর লাউ চাষিরা। বাধ্য হয়ে অনেকে কেটে ফেলছেন লাউগাছ।
হাসিনুরের মতো আটোয়ারীর অনেক লাউ চাষিই এখন দিশেহারা। কৃষকদের অভিযোগ, বাজারজাতকরণে অব্যবস্থাপনা ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যের কারণে মাঠপর্যায়ে তারা ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। অন্যদিকে খুচরা বাজারে চড়া দাম গুনতে হচ্ছে ক্রেতাদের।
স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, পঞ্চগড়ে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০ হেক্টর জমিতে লাউয়ের আবাদ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে ফলনও হয়েছে ভালো। তবে বাম্পার ফলনেও কৃষকের মুখে হাসি নেই। ন্যায্য দাম না পাওয়ায় তাদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা।
কৃষকরা জানিয়েছেন, ক্ষেত থেকে আড়তে লাউ পৌঁছাতেই প্রতি পিসে পরিবহন খরচ পড়ে এক টাকার বেশি। অথচ আড়তে বিক্রির দাম মাত্র এক থেকে দুই টাকা। এতে উৎপাদন খরচ তো উঠছেই না, অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন খরচও তুলতে পারছেন না তারা।
আটোয়ারী উপজেলার কিসমত এলাকার কৃষক হাসিনুর রহমান ধারদেনা করে নিজের ১০ শতক জমিতে লাউ চাষ করেছিলেন। উৎপাদন খরচ ও বিক্রির দামের ব্যবধান তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘সবার দাম বাড়িলেও বাড়ে, কৃষকের মালের দাম খালি কমে। সারের দাম বেশি, কামলার (মজুরি) দাম বেশি। ধারদেনা করি ১০ শতকত লাউ করিছিনু, আর সেই লাউয়ের দাম যদি ১-২ টাকা পিছ হয়, তাহিলে হামেরা কেন-গো বাঁচিমো! সরকার যদি হামার তানে দামটা ঠিক করি দেয়, তহিলে হামরা বাঁচবা পারিমো।’
অন্যদিকে আড়তদার ও ব্যবসায়ীদের দাবি, পঞ্চগড়ের বাজারে লাউয়ের সরবরাহ বেশি হলেও ঢাকাসহ অন্যান্য জেলায় চাহিদা তুলনামূলক কম। এ ছাড়া পণ্য ওঠানো-নামানো ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় তারাও কাঙ্ক্ষিত লাভ করতে পারছেন না।
কৃষক ও ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজার তদারকি ও কার্যকর বিপণনব্যবস্থার অভাবেই উৎপাদক পর্যায় এবং খুচরা বাজারে দামের এত বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ে তদারকির ঘাটতির অভিযোগ মানতে নারাজ জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর।
পঞ্চগড় জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মুয়াল্লেমা খানম জানিয়েছেন, পর্যাপ্ত জনবল না থাকলেও তারা বাজার তদারকি চালিয়ে যাচ্ছেন। দ্রুত লাউসহ অন্যান্য সবজির বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে।
মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমাতে কৃষকদের সমবায় পদ্ধতিতে একসঙ্গে পণ্য বাজারজাত করার পরামর্শ দিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। পঞ্চগড় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আব্দুল মতিন জানালেন, কৃষকরা সরাসরি বড় বাজারগুলোয় পণ্য পাঠাতে পারলে ন্যায্য দাম পাওয়ার সুযোগ বাড়বে।




