মিলের পানিতে বিলের সর্বনাশ

রক্তদহ বিলের শাখা খালের দৃশ্য
স্বয়ংক্রিয় চালকলের বিষাক্ত পানি ও বর্জ্যের কারণে মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ঐতিহাসিক রক্তদহ বিলের পরিবেশ। এক সময় মাছের জন্য খ্যাত এ বিল এখন প্রায় মাছশূন্য। বিল ও এর শাখা খালগুলো থেকে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, জলজ প্রাণী এবং শাপলা, পদ্ম, শালুকসহ নানা জলজ উদ্ভিদ প্রায় হারিয়ে গেছে। এর ফলে মাছ শিকারনির্ভর কয়েকশ জেলে পরিবার জীবিকা সংকটে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সান্তাহার শহর ও আশপাশে গড়ে ওঠা প্রায় ১২টি স্বয়ংক্রিয় চালকলের বর্জ্য ও বিষাক্ত পানি ইরামতি ও ইন্দইল খাল হয়ে রক্তদহ বিলে গিয়ে জমা হচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা এ দূষণের ফলে মাছের মৃত্যু ঘটছে, নষ্ট হচ্ছে প্রজননক্ষমতা। বর্ষার শুরুতে একসময় বিল ও খালে প্রচুর মাছের রেণুপোনা দেখা গেলেও এখন তার অস্তিত্ব প্রায় নেই।
স্থানীয়রা জানান, একসময় রক্তদহ বিলের মাছ দিয়ে এলাকার চাহিদা মিটিয়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হতো। বর্তমানে আশপাশের গ্রামগুলোতেও পর্যাপ্ত মাছ পাওয়া যায় না। একই সঙ্গে বিষাক্ত পানির প্রভাবে কৃষিজমিও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ধানের খেতে দূষিত পানি প্রবেশ করলেই চারা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
বিলপাড়ের সান্দিড়া, দমদমা, তারাপুর, ছাতনী, প্রসাদখালী, বোদলা ও রাজাপুর গ্রামের কয়েকশ পরিবার মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করত। মাছের সংকট দেখা দেওয়ায় অনেকেই বেকার হয়ে পড়েছেন, আবার অনেকে বাধ্য হয়ে পেশা পরিবর্তন করেছেন।
প্রসাদখালী গ্রামের জেলে কানু হালদার জানান, বাপ-দাদার আমল থেকে তাদের পরিবার এই বিলে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। কিন্তু এখন বিলে মাছ না থাকায় অধিকাংশ জেলে পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে। তার ভাষ্য, সান্তাহার এলাকার চালকলগুলোর বর্জ্য পানি বিলে এসে পুরো জলাশয়ের ক্ষতি করেছে। একজন জেলে সারা রাত মাছ ধরেও দুইশ টাকার মাছ পান না।
দমদমা গ্রামের বাসিন্দা রাইসুল ইসলাম উল্লেখ করেন, তাদের গ্রাম বিলের খুব কাছাকাছি হওয়ায় দূষণের প্রভাব সরাসরি ভোগ করতে হচ্ছে। দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে বিলের আশপাশে যাওয়া যায় না। বাতাস জোরে বইলে বাড়িতে অবস্থান করাও কষ্টকর হয়ে ওঠে।
একই গ্রামের আশফাকুল আশেকিন দাবি করেন, বিলসংলগ্ন জমিতে যারা চাষাবাদ করছেন, তাদের অনেকেই চর্মরোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হচ্ছেন।
সম্প্রতি বিল পরিদর্শনে গিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আব্দুল মহিত তালুকদার এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম অভিযোগের সত্যতা পান। এ সময় সংসদ সদস্য ক্ষতিগ্রস্তদের সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দেন।
বিষয়টি নিয়ে বগুড়া পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মাহাতির মোহাম্মদ বলেছেন, শিল্পকারখানার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে উচ্চ আদালতের নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী চালকল মালিকদের নির্দিষ্ট স্থানে পুকুর খনন করে গরম পানি ও বর্জ্য সংরক্ষণ করতে হবে। পানি ঠান্ডা ও প্রক্রিয়াজাত হওয়ার পর তা জলাশয়ে ছাড়তে হবে।








