ভবদহে জলাবদ্ধতা
ঘর ডুবেছে পানিতে চিত্রার সংসার সড়কে
- ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেটের সবকটি কপাট খোলা রয়েছে

ছবি: আগামীর সময়
একসময় এ সড়ক ধরেই হেঁটে বাড়ি ফিরতেন ক্ষুদিরাম বিশ্বাস। এখন সে সড়কই তার ঠিকানা; সড়কের পাশেই টিনের ছাপরা তুলে কাটছে তার দিন-রাত। পাশে শুয়ে রয়েছেন অসুস্থ স্ত্রী চিত্রা বিশ্বাস। মাথার ওপর টিনের ছাউনি, এক পাশে রান্নার ব্যবস্থা, অন্য পাশে থাকার জায়গা। এভাবেই চার মাস ধরে সড়কের পাশে তাদের সংসার। অথচ কিছুদিন আগেও নিজের ঘর, উঠান, গোয়ালঘর— ছিল সাজানো-গোছানো সংসার। ভবদহের জলাবদ্ধতা কেড়ে নিয়েছে সেই স্বাভাবিক জীবন। বসতঘর এখনো পানির নিচে, উঠানে হাঁটুপানি। কবে সেই ঘরে ফিরতে পারবেন, তা জানেন না ৬০ বছরের ক্ষুদিরাম।
যশোরের মনিরামপুর উপজেলার সুজাতপুর গ্রামের বাসিন্দা ক্ষুদিরামের জীবনে এই দুর্ভোগের সঙ্গে যোগ হয়েছে আরেক কঠিন বাস্তবতা। তার স্ত্রী চিত্রা বিশ্বাসের বয়স ৪৮ বছর। দুই দফা স্ট্রোকের পর প্রায় তিন বছর বিছানায় পড়ে রয়েছেন তিনি। স্ত্রীর দেখাশোনার জন্য দিনের বেশিরভাগ সময় বাড়িতে থাকতে হয় ক্ষুদিরামকে। নিজেরও লিবারে সমস্যা থাকায় বেশি পরিশ্রম করতে পারেন না। তবু বিকালে ভ্যান নিয়ে বের হন, যদি কিছু টাকা রোজগার করা যায় সে আশায়। দুই মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছোট মেয়ে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু টাকা পাঠান। সেই টাকা আর ক্ষুদিরামের সামান্য আয়েই চলে দুজনের সংসার।
সংসার চালানোর চেয়েও এখন বড় দুশ্চিন্তা দুজনের চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ। প্রতি মাসে ওষুধ কিনতেই লাগে প্রায় ৫ হাজার টাকা। এর সঙ্গে রয়েছে খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ। সড়কের পাশে অস্থায়ী ছাপরায় দিন কাটলেও দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ে না। রাতে চুরি হওয়ার আতঙ্ক, পানিতে ডুবে থাকা ঘরের জিনিসপত্রের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠা— সব মিলিয়ে স্বস্তি নেই কোথাও।
ক্ষুদিরাম বলছিলেন, ‘ঘরের মধ্যে এক হাত পানি উঠেছিল। এখন পানি কমে এক বিঘত হয়েছে। কিন্তু উঠানে এখনো হাঁটুপানি। তিন-চার মাস ধরে রাস্তায় আছি। এক পাশে ছোট্ট ছাপরার নিচে কোনো রকমে রান্না করি, অন্য পাশে স্ত্রীকে নিয়ে থাকি। স্ত্রী দুবার স্ট্রোক করেছে। আমিও বেশি পরিশ্রম করতে পারি না। বিকালে ভ্যান চালিয়ে যা পাই, তা দিয়ে সংসার চলে না। ছোট মেয়ে কিছু টাকা দেয়। তা দিয়ে দুজনের ওষুধ কিনতে হয়। মাসে ওষুধেই ৫ হাজার টাকা চলে যায়। ঘরে ফিরব কবে, স্ত্রীর চিকিৎসা কীভাবে করব— কিছুই বুঝতে পারছি না।’
ক্ষুদিরাম-চিত্রার এই দুর্দশা শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। ভবদহের জলাবদ্ধতায় বছরের পর বছর ধরে ঘরবাড়ি ছেড়ে সড়ক, বাঁধ কিংবা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হওয়া অসংখ্য মানুষের জীবনের প্রতিচ্ছবি এটি।
মনিরামপুর উপজেলার হাটগাছা গ্রামের বাসিন্দা দিলীপ বৈরাগী বললেন, ক্ষুদিরাম বিশ্বাসের মতো অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে পানির কারণে দুর্ভোগে পড়েছে। নিজের ঘরবাড়ি ছেড়ে সড়কের পাশে থাকা যে কতটা কষ্টের, তা ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ বুঝতে পারবেন না। বিশেষ করে অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে ক্ষুদিরামের জীবন আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। তার কথায়, দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করে এসব মানুষকে নিজের ঘরে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
ভবদহ অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে পানি নিষ্কাশনের নদী-খালগুলোতে পলি জমে নাব্য কমে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি দ্রুত নামতে পারছে না। যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলার কিছু অংশ জুড়ে বর্ষা এলেই দেখা দেয় জলাবদ্ধতা। এবারও দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় বহু পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছে সড়ক ও বাঁধের পাশে। ডুমুরতলা গ্রামের স্কুলশিক্ষক শিবপদ মণ্ডল জানালেন, তার গ্রামের প্রায় ১০০টি বাড়িতে কমবেশি পানি উঠেছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বললেন, ‘কয়েক দিন পরপর সাংবাদিকরা আসেন, ছবি তুলে নিয়ে যান; কিন্তু আমাদের তাতে কোনো কাজ হয় না।’
জলাবদ্ধতার প্রভাব পড়েছে কৃষিতেও। দীর্ঘদিন জমি পানির নিচে থাকায় চলতি বছর ভবদহের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুরের নিম্নাঞ্চলে প্রায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়নি। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা, চাপে পড়েছে স্থানীয় অর্থনীতিও।
ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত চার দশকে খাল খনন, নদী পুনঃখনন ও স্লুইসগেট সংস্কারসহ নেওয়া হয়েছে নানা প্রকল্প। ব্যয় হয়েছে বিপুল অর্থ। তবু স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় প্রতি বছর বর্ষা এলেই নতুন করে পানিবন্দি হতে হয় মানুষকে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, প্রায় ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভবদহ অঞ্চলের হরি, তেলিগাতী, হরিহর, আপার ভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজ চলছে। পাশাপাশি এসব নদীর সঙ্গে যুক্ত ২৪টি খালের প্রায় ৭৮ কিলোমিটার পুনঃখননের কাজও চলমান।
মনিরামপুর উপজেলার কুলটিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য বিদ্যুৎ বৈরাগী বললেন, ভবদহের জলাবদ্ধতায় এলাকার অনেক পরিবার দীর্ঘদিন ধরে চরম দুর্ভোগে রয়েছে। অসুস্থ স্বজনকে নিয়ে ঘরবাড়ি ছেড়ে সড়কের পাশে মানবেতর জীবন কাটাতে হচ্ছে অনেককে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি নদী-খাল সচল করে জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান চান তারা।
অন্যদিকে, ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির দাবি, শুধু নদী খনন করে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার সমাধান সম্ভব নয়। এজন্য দীর্ঘদিন ধরে জোয়ারাধার বা টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্ট (টিআরএম) চালু এবং আমডাঙ্গা খাল সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন কমিটির নেতারা।
যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেছেন, ছয়টি নদীর পুনঃখননের কাজ চলছে। ভবদহ ২১-ভেন্ট স্লুইসগেটের সবকটি কপাট খোলা রয়েছে এবং সেখান দিয়ে পানি বের হচ্ছে। দ্রুত পানি কমে যাবে বলে তারা আশা করছেন।
কিন্তু নদী খননের কাজ, প্রকল্পের হিসাব কিংবা পানি কমার আশ্বাস— কোনোটিই এখনো ক্ষুদিরাম-চিত্রার জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারেনি ঘরের নিশ্চয়তা। তাদের কাছে সবচেয়ে বড় চাওয়া, আবার নিজের ঘরে ফেরা; অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে অন্তত নিরাপদে রাত কাটানো। যে সড়ক দিয়ে একসময় বাড়ি ফিরতেন ক্ষুদিরাম, সে সড়কই এখন তার সংসারের ঠিকানা। পানিতে ডুবে থাকা বসতভিটা থেকে কবে পানি নামবে, কবে শেষ হবে এই অনিশ্চিত জীবন— সে অপেক্ষাতেই দিন কাটছে তাদের।



