কুড়িগ্রামে দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্রে ভাঙন
ঢেউয়ে ভাসছে মানুষের স্বপ্ন

দুধকুমার নদের ভাঙনে বিলীন হয়েছে ধাউরার কুটি গ্রামের অন্তত ৩০টি বাড়ি। ছবি: আগামীর সময়
‘ঘরবাড়ি সব গেল। খাওয়ার কিছু নেই, থাকার জায়গা নেই। এই বৃষ্টি-বাদলের মধ্যে কোথায় থাকি?’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার আন্ধারীঝাড় ইউনিয়নের ধাউরার কুটি গ্রামের আজিফা বেগম। প্রায় ৪০ বছরের সংসার তার— বিলীন হয়েছে এক বিকালের নদীভাঙনে। তবু নদের পাশে পড়ে থাকা টিন, বাঁশ আর গৃহস্থালির সামান্য জিনিসপত্র বাঁচানোর শেষ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
শুধু আজিফা বেগমের নয়, দুধকুমার নদের ভাঙনে বিলীন হয়েছে ধাউরার কুটি গ্রামের অন্তত ৩০টি বাড়ি। স্থানীয়দের আশঙ্কা, আরও প্রায় ২০০টি পরিবার রয়েছে একই ঝুঁকিতে।
আজিফা বেগমের প্রতিবেশী রোকেয়া বেগমও হারিয়েছেন বসতভিটা। গ্রামের আরও অনেক পরিবার এখন গৃহহীন। তাদের দাবি, সাময়িকভাবে জিওব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা নয়, প্রয়োজন নদীশাসনের স্থায়ী ব্যবস্থা।
গত তিন দিনে কমতে শুরু করেছে কুড়িগ্রামের ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমার ও ধরলা নদীর পানি। জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও নতুন করে দেখা দিয়েছে নদীভাঙনের সংকট।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজারহাটে তিস্তার ভাঙন কিছুটা কমলেও ভূরুঙ্গামারীতে দুধকুমার এবং চিলমারী উপজেলার চর কড়াই বরিশাল ও চর শাখাহাটি এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে অন্তত ৮০টি পরিবার হারিয়েছে বসতভিটা। অনেকেই এখন আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বা অস্থায়ী আশ্রয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
চিলমারীর চর কড়াই বরিশাল গ্রামের আদরি বেগম বলছিলেন, ‘নদী আমাদের সবকিছু কাইড়া নিল। একদিনে সব শেষ। বসতভিটা চলে গেছে নদীর পেটে। এখন পরিবার নিয়ে কোথায় যাব, কিছুই পারছি না বুঝতে।’
একই এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আঁখি বেগমের কণ্ঠেও হতাশা। ‘সরকারের দেওয়া ঘরেই ছিলাম। সেই ঘরটাও নিয়ে গেছে নদী। ১০ বছরের প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় থাকব, সেটাই বুঝতে পারছি না’— বলছিলেন তিনি। স্থানীয় বাসিন্দা রিয়াজুলের দাবি, গত তিন দিনে শুধু একটি আবাসন প্রকল্পের ৪০টি পরিবার নয়, পুরো এলাকায় অন্তত ৬০টি পরিবার হারিয়েছে ঘরবাড়ি। ভাঙন ঠেকাতে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হলেও তা নদীর স্রোতে টেকেনি।
আরেক বাসিন্দা মেহেদী জানালেন, কখনো কখনো আধা ঘণ্টার মধ্যেই ২০টি বাড়ি চলে গেছে নদীতে। বিশারপাড়া আশ্রয়কেন্দ্রের অর্ধশতসহ ১০০ পরিবার হারিয়েছে ভিটেমাটি। তার অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে এখনো দেখা যায়নি কার্যকর কোনো উদ্যোগ।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই নতুন উদ্বেগের কথা জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সংস্থাটি বলছে, রংপুর বিভাগে তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকায় এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, মেঘালয়, অরুণাচল ও আসামে আগামী পাঁচ দিন মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। এর প্রভাবে ৪-৬ জুলাই ব্রহ্মপুত্র নদের পানি আবারও সতর্কসীমা স্পর্শ করে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করতে পারে।
যদিও বর্তমানে কমছে কুড়িগ্রামের সব নদ-নদীর পানি। দুধকুমার নদের পানি প্রবাহিত হচ্ছে বিপৎসীমার নিচ দিয়ে। কমছে ধরলা ও ব্রহ্মপুত্রের পানিও।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, জনগুরুত্ব বিবেচনায় বিভিন্ন স্থানে জিও ব্যাগ ফেলে চেষ্টা চলছে ভাঙন ঠেকানোর। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের ভাষ্য, কমছে নদ-নদীর পানি। সব নদীতেই রয়েছে ভাঙন। জনগুরুত্ব বিবেচনায় জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন প্রতিরোধে নেওয়া হচ্ছে ব্যবস্থা। জনবসতিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রতিরক্ষা কাজ চলমান।
তবে নদীতীরের মানুষের অভিজ্ঞতা বলছে ভিন্ন কথা। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় জিও ব্যাগের বরাদ্দ খুবই কম। অনেক জায়গায় নদীর স্রোতে ব্যাগগুলো টেকেও না। ফলে ভাঙন থামে না; বরং প্রতিদিন নতুন নতুন পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়ে।




