টাকা আত্মসাতের অভিযোগ
পাসবইয়ে ঋণ শোধ, অফিসের খাতায় বকেয়া

কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়। ছবি: আগামীর সময়
পাসবইয়ে ঋণ পরিশোধের হিসাব থাকলেও অফিসের লেজারে বকেয়া। ঋণ শোধ করেও মিলছে না মুক্তি, উল্টো নতুন করে টাকা পরিশোধের জন্য দেওয়া হচ্ছে চাপ। কারও কাছে দাবি করা হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা, কারও কাছে ২২ হাজার। কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ে ঋণের কিস্তির টাকা আত্মসাৎ ও হিসাবের গরমিলের অভিযোগে এমন ভোগান্তিতে পড়েছেন একাধিক ঋণগ্রহীতা। অভিযোগের কেন্দ্রে আছেন কার্যালয়টির সাবেক ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তা রাজু।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তারা নিয়মিত কিস্তির টাকা রাজুর হাতে জমা দিয়েছেন। কিন্তু তিনি সেই টাকা কার্যালয়ে জমা না দেওয়ায় পাসবইয়ে ঋণ পরিশোধের হিসাব থাকলেও অফিসের লেজারে তা বকেয়া দেখানো হচ্ছে। ফলে ঋণ পরিশোধের পরও তাদের নতুন করে টাকা জমা দিতে বলা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রাজারহাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের এক কর্মচারী জানিয়েছেন, অধিকাংশ ঋণগ্রহীতার ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটেছে। রাজু কার্যালয়ে কর্মরত থাকাকালে গ্রাহকদের কাছ থেকে কিস্তির টাকা আদায় করে নিজের কাছে রাখতেন। কিন্তু তা অফিসে জমা দিতেন না। এ কারণে গ্রাহকদের পাসবইয়ে টাকা জমার হিসাব থাকলেও অফিসের আদায় খাতা ও লেজারে সেই টাকার কোনো তথ্য নেই।
এমন ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন কার্যালয়টির ঋণগ্রহীতা বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের মনেশ্বর গ্রামের মোছা. লাভলী বেগম, একই ইউনিয়নের ঋণগ্রহীতা মোছা. লাকী বেগম এবং কানুরাম এলাকার বাসিন্দা মো. লুৎফর রহমান।
রাজারহাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয়ের ৮১৮ নম্বর ঋণগ্রহীতা লাভলী বেগম ২০২৪ সালের ১২ জুন মুরগির খামার ও গরু মোটাতাজাকরণ প্রকল্পের আওতায় দেড় লাখ টাকা ঋণ নেন। তার দাবি, নিয়মিত মাসিক কিস্তি পরিশোধ করে ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই পুরো ঋণ শোধ করেন। অর্থাৎ ১৩ মাস ১৯ দিনের মধ্যে তিনি ঋণের টাকা পরিশোধ করেন।
তবে ঋণ পরিশোধের পরও তার ভোগান্তি শেষ হয়নি। লাভলী বেগমের অভিযোগ, ঋণের টাকা শোধ করার পরও উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে তাকে একাধিকবার ফোন করে বকেয়া পরিশোধের কথা বলা হয়েছে। এমনকি তার কাছে আরও ৪০ হাজার টাকা পাওনা রয়েছে বলেও দাবি করা হচ্ছে।
ক্ষোভ প্রকাশ করে লাভলী বেগম বললেন, ‘হামরা দেড় লাখ টাকা ঋণ নিছি। প্রতি মাসে কিস্তি দিয়া ১৩ মাসে পরিশোধ করি দিছি। এখন ফির কল দিয়া কয়, আরও ৪০ হাজার টাকা দেওন নাগবে। কল দিয়া ডাকাতির আলাপ করে। এক ঋণ কয়বার শোধ করমো? হামরা কিস্তির টাকা রাজুক দিছি, রাজুক যাইয়া ধরুক।’
তার স্বামী মো. শফিকুল বললেন, ‘কিস্তি ঠিকঠাকভাবে দিছি। কষ্ট করা টাকা হামার। কিস্তি তুলি ওমার অফিসার টাকা খাইছে, অফিসে দেয় নাই। তা হামরা কী করমো?’
একই কার্যালয়ের ৭৮০ নম্বর ঋণগ্রহীতা লাকী বেগমের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। ২০২৩ সালের ৩০ মার্চ তিনি দুই বছর মেয়াদি ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তার দাবি, ওই বছরের ৯ জুলাই থেকে নিয়মিত মাসিক কিস্তি দেওয়ার পাশাপাশি এককালীন ২০ হাজার টাকা জমা দেন। সব মিলিয়ে ২০২৩ সালের ৯ ডিসেম্বর, ঋণ নেওয়ার মাত্র ছয় মাসের মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধ করেন। তার পাসবইয়েও ঋণ পরিশোধের হিসাব রয়েছে।
কিন্তু ঋণ শোধের পরও চেক, জমির কাগজপত্র ও সঞ্চয়ের টাকা ফেরত পেতে তাকে প্রায় দুই বছর ধরে কার্যালয়ে ঘুরতে হয়েছে। একপর্যায়ে তাকে জানানো হয়, এখনো ৫ হাজার টাকা কিস্তি বাকি রয়েছে। লাকী বেগমের অভিযোগ, ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তা রাজু তার কাছ থেকে কিস্তির টাকা নেওয়ার পর পাসবইয়ে হিসাবের গরমিল করেছেন। এমনকি এককালীন জমা দেওয়া ২০ হাজার টাকাও পাসবইয়ে একবারে না তুলে পরবর্তী সময়ে অল্প অল্প করে হিসাবভুক্ত করেছেন।
লাকী বেগম বললেন, ‘আমি কিস্তির টাকা ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তা রাজুকে দিয়েছি। তিনি আমার বইয়ে নয়-ছয় করে টাকা উঠিয়েছেন। এককালীন ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলাম, কিন্তু তিনি সেটিও পরবর্তী সময়ে কম কম করে উঠিয়েছেন। আমার টাকা পরিশোধ হওয়ার পরও অফিস থেকে একাধিকবার ফোন করে ঋণ পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। ঋণ শোধ করার পরও এমন হয়রানির কারণ কী, তা তারাই জানে। এখন পর্যন্ত আমার কাগজপত্র ও চেক ফেরত দেয়নি।’
একই অভিযোগ করেছেন কানুরাম এলাকার বাসিন্দা কেরামত আলীর ছেলে মো. লুৎফর রহমান। তিনি ২০২৩ সালে উপজেলা যুব উন্নয়ন কার্যালয় থেকে ৪০ হাজার টাকা ঋণ নেন। তার দাবি, ওই বছরই পুরো ঋণ পরিশোধ করেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে তাকেও বকেয়া ঋণের কথা জানানো হয়। বর্তমানে তার কাছে ২২ হাজার টাকা বকেয়া রয়েছে বলে কার্যালয় থেকে দাবি করা হচ্ছে।
লুৎফর রহমান বললেন, ‘আমি রাজুকে কিস্তি দিছি। রাজু নাকি অফিসে টাকা জমা দেয়নি। এখন শুনি, ২২ হাজার টাকা জমা হয় নাই। আমি অফিসে গেছিলাম, কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি। রাজুকে ফোন দিই, ফোন ধরে না। বলছে সমাধান করবে, কিন্তু করে না।’
অভিযোগের বিষয়ে সাবেক ঋণ আদায়কারী কর্মকর্তা রাজুর সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বললেন, ‘আমি বদলি হওয়ার পর পোস্টিং দেওয়ার সময় পাইনি। এজন্য লেজারে ওঠেনি। আমি পাঁচ-সাত দিনের মধ্যে গিয়ে বিষয়টি সমাধান করব।’
রাজারহাট উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. একরামুল হক সম্প্রতি এ ধরনের ঘটনাকে ‘ডাকাতি’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ঋণ নেওয়ার সময় এমনিতেই কিছু কর্মকর্তা ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা ঘুষ নেন। কিন্তু গ্রাহকের কাছ থেকে ঋণের কিস্তির টাকা নিয়ে অফিসে জমা না দেওয়া একরকম ডাকাতি। আমি এই অফিসে আসার পর এমন কয়েকটি ঘটনা পেয়েছি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। এ কারণে আমাকে এখান থেকে সরাতে ঢাকায় কাগজ পাঠানো হয়েছে।’
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আব্দুর রশিদ বলেছেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




