কে বাঁচাবে ইছামতী শ্যামাসুন্দরীদের
- দখল-দূষণে বিপন্ন রংপুরের ৬ নদনদী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যে নদীর তীরে গড়ে উঠেছিল আদি রংপুর, সেই ইছামতীর নাম এখন এর তীরের অনেকেই জানেন না। অথচ রংপুর নগরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ইছামতী, ঘাঘট, শ্যামাসুন্দরী, বুড়াইল, খোকসা ঘাঘট ও আলাইকুমারী নদনদী ঘিরেই রংপুর আদর্শ নগরী হয়ে উঠতে পারত। কিন্তু দখল-দূষণে বিপন্ন একসময়ের খরস্রোতা এসব নদী এখন শুধুই অতীত।
তবে রংপুরের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এসব নদনদী পর্যায়ক্রমে সংস্কার হলে পাল্টে যাবে রংপুর নগরীর চিত্র।
সম্প্রতি সরেজমিন দেখা যায়, সাতমাথা থেকে কিছুদূর এগোলে নগরীর পুরাতন শহর হিসেবে পরিচিত মাহিগঞ্জে যাওয়ার পথেই ইছামতী নদী। নদীর দুপাশ দখল করে স্থানীয়রা গড়ে তুলেছেন ঘরবাড়ি।
এই নদীর তীরে একসময় গড়ে উঠেছিল এ অঞ্চলের বৃহত্তম বন্দর মাহিগঞ্জ। দেশ-বিদেশ থেকে অসংখ্য বড় বড় জাহাজ আসত এই বন্দরে। মাহিগঞ্জের পশ্চিমে শ্যামাসুন্দরী নদীর সঙ্গে সংযোগ রয়েছে ইছামতীর। নদীটির একটি ক্ষীণ ধারা প্রবাহিত হয়ে মাহিগঞ্জের উত্তর-পশ্চিমে নাচনিয়ার বিলের সঙ্গে মিলেছে।
মাহিগঞ্জের বাসিন্দা মকবুল হোসেন (৬০) জানালেন, ইছামতী ঘিরে মাহিগঞ্জে একসময় নদীবন্দর ছিল। সেটি হারিয়ে গেছে অনেক আগেই। ইছামতীর যেটুকু অস্তিত্ব রয়েছে, তা-ও দখল হয়ে যাচ্ছে। অনেক স্থানে ভরাট হয়ে গেছে নদী। রংপুর নগরীর পূর্ব প্রান্তে সাতমাথা এলাকায় খোকসা ঘাঘট নদীটি এখন পরিণত হয়েছে খালে। কোথাও কোথাও এই নদীর অস্তিত্ব হারিয়ে গেছে।
নদীর পাড়ের সাতমাথা এলাকার আব্দুল হাদী ও সেকেন্দার আলী জানিয়েছেন, বাপ-দাদাদের কাছে শুনেছেন খোকসা ঘাঘট একসময় খরস্রোতা নদী ছিল। এই নদী ঘিরে ব্যবসা ছিল। কালের পরিক্রমায় দখল-দূষণের ফলে এই নদীর অস্তিত্ব আজ হুমকির মুখে।
রংপুর নগরীর সাতমাথা হয়ে দক্ষিণ প্রান্ত দিয়ে বয়ে যাওয়া পার্কের মোড় এলাকায় খোকসা ঘাঘটের হাল আরও করুণ। সেখানে এটি নদী বলে চেনাই যায় না। বর্জ্য, বিভিন্ন বাসাবাড়ির পয়ঃনিষ্কাশনের ফলে ওই এলাকায় নদী থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।
নগরীর মডার্ন এলাকার হাসান ফেরদৌস রাসেল জানালেন, খোকসা ঘাঘটের দুই পাড়ে নদীর জমি দখল করে শত শত মানুষ ঘরবাড়ি তৈরি করে বাস করছেন, অনেকে গড়ে তুলেছেন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। নদীর অস্তিত্ব যেটুকু রয়েছে, তা-ও বিপন্ন হয়ে পড়েছে দূষণে।
রংপুর নগরীর প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া শ্যামাসুন্দরী নদীর ১৭০ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের কাজও দীর্ঘদিন ধরে থমকে আছে। খালের হাল জরিপে ১৭০ অবৈধ দখলদারকে চিহ্নিত করা হলেও ১১ দখলদারের আপত্তিতে আটকে আছে উচ্ছেদ অভিযান। ফলে শ্যামাসুন্দরী আশীর্বাদের পরিবর্তে এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। ঘাঘট নদ, বুড়াইল ও আলাইকুমারী নদীর অবস্থাও একই রকম।
রিভারাইন পিপলের পরিচালক ও বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ড. তুহিন ওয়াদুদ মনে করেন, এ নদীগুলো রক্ষা করা না গেলে এই অঞ্চলের কৃষিনির্ভর অর্থনীতি, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ সবকিছুই হুমকির মধ্যে পড়বে।
এ ব্যাপারে রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বললেন, শ্যামাসুন্দরীকে দৃষ্টিনন্দন করতে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কারকাজ শুরু হয়েছিল। কাজ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ায় আপাতত তা বন্ধ আছে। কাজটি সম্পন্ন হলে শ্যামাসুন্দরীর প্রাণ ফিরবে। এরই মধ্যে ঘাঘট নদের বেশকিছু অংশ সংস্কার করেছে সেনাবাহিনী। সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আলোচনা করে ইছামতীসহ অন্য নদীগুলো সংস্কারেও উদ্যোগ নেওয়া হবে।




