খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুষ্ঠান বর্জন জামায়াতের, হট্টগোল-বিশৃঙ্খলা

খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) আয়োজিত ‘আগামীর খুলনা বিনির্মাণে কেডিএ ও জনগণের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময়সভা বয়কট করেছে খুলনা মহানগর ও জেলা জামায়াতে ইসলামী।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথিসহ কয়েকজন অতিথিও উপস্থিত হননি। এ ছাড়া বিশেষ অতিথিদের বক্তৃতা চলাকালে দুই দফায় হট্টগোল ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এতে অনুষ্ঠানটি বাধাগ্রস্ত হয়।
আজ শনিবার সকাল সাড়ে ৯টায় খুলনা বিভাগীয় কমিশনার কার্যালয়ের অডিটোরিয়ামে এ সভা আয়োজন করা হয়। সভা শুরুর সময় সকাল সাড়ে ৯টায় নির্ধারিত ছিল।
তবে সাড়ে ১০টার দিকে লোয়ার যশোর রোড থেকে ভেন্যুতে ঢোকার পথে খুলনা মহানগর জামায়াতে ইসলামীর একজন নেতাকে বেশ কয়েকজন কর্মীসহ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
তাদের সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার কারণ জিজ্ঞেস করলে জানালেন, মতবিনিময় সভার ব্যানারে জামায়াতে ইসলামীর দুই এমপি যথাক্রমে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ ও খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর হোসাইন হেলালের নাম না থাকায় আমরা সভা ছেড়ে চলে এসেছি।
কেডিএ’র চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মনা সাহেব ব্যানারে তাদের নাম লেখা হবে জানিয়েছেন। সেটা হলে আমরা এমপি সাহেবদের জানাব এবং তাদের নিয়ে সভায় যাব।
সভাটি পৌনে ১১টার দিকে শুরু হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর দুইজন এমপির নাম ডিজিটাল ব্যানারে ভেসে উঠতে দেখা যায়। কিন্তু সভায় জামায়াতে ইসলামীর কেউ আর ফেরত আনেননি।
এ ব্যাপারে খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, কেডিএ’র উন্নয়ন ভাবনাবিষয়ক অনুষ্ঠানে জামায়াতের দুইজন সংসদ সদস্যকে দাওয়াত দেওয়া হয়। একটি কার্ডে আমাদের দুইজন সংসদ সদস্যের নাম লেখা থাকলেও বিতরণকৃত অন্য একটি দাওয়াত কার্ডে নাম রাখা হয়নি।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানস্থলের ব্যানারেও খুলনার দুইটি আসন থেকে নির্বাচিত জামায়তে ইসলামীর সংসদ সদস্য যথাক্রমে খুলনা-২’র অ্যাডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল ও আমার (খুলনা-৬’র সংসদ সদস্য মওলানা আবুল কালাম আজাদ) নাম বাদ দিয়ে ব্যানার করা হয়েছে। এজন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ অনুষ্ঠান বয়কট করেছে।
অপরদিকে, হট্টগোল শুরু হয় বিশেষ অতিথিদের বক্তৃতা চলাকালে। একজন বিশেষ অতিথি (সাংবাদিক নেতা) তার বক্তৃতায় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নগরীর শিববাড়ী মোড়ে ভেঙে ফেলা ‘জিয়া হলের’ জায়গায় একটি সিটি সেন্টার স্থাপনের পরামর্শ দেন। তিনি একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে বহু শ্রোতা উত্তেজিত হয়ে ওঠেন। তারা দাঁড়িয়ে উচ্চকণ্ঠে প্রতিবাদ করতে করতে তার দিকে তেড়ে যাওয়ার চেষ্টা করে।
তারা বললেন, ওটা ‘সিটি সেন্টার’ না, ওটা জিয়া হল ছিল ওখানে ‘জিয়া হলই’ হবে। এ সময় উপস্থিত উত্তেজিত ব্যক্তিরা ওই সাংবাদিক নেতাকে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের দোসর উল্লেখ করতে থাকেন। তীব্র হট্টগোলের মধ্যে তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে দেওয়ার দাবি জানান। এ সময় সভাটি বাধাগ্রস্ত হয়। পরে পুলিশের সহায়তায় কঠোর নিরাপত্তার মাধ্যমে তাকে মঞ্চ থেকে নামিয়ে একটি গাড়িতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর বিশেষ অতিথি খুলনা জেলা পরিষদের প্রশাসক ও জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনিরুল হাসান বাপ্পী মঞ্চ থেকে নেমে গিয়ে উত্তেজিত ব্যক্তিদের শান্ত করেন।
এদিকে, সভার প্রধান অতিথি হিসেবে জাতীয় সংসদের হুইপ রকিবুল ইসলাম বকুল এবং বিশেষ অতিথি খুলনা-৪ ও ৫ আসনের এমপি আজিজুল বারী হেলাল ও আলি আসগর লবির নাম লেখা ছিল, কিন্তু তারা আসেননি। পরে খুলনা-১ আসনের এমপি আমীর এজাজ খানকে প্রধান অতিথি হিসাবে ঘোষণা করা হয়।
এ বিষয়ে কেডিএ’র চেয়ারম্যান আ্যাডভোকেট শফিকুল আলম মনা বলেছেন, খুলনার উন্নয়নে সকল নাগরিকের অংশ গ্রহণের লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে সকলকেই দাওয়াত দেওয়া হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর দুই সংসদ সদস্যের নামও দাওয়াত কার্ড ও ব্যানারে দেওয়া হয়েছে। তারা যে অভিযোগ করেছে সেটি সঠিক নয়।
সাংবাদিক নেতার বিষয়ে তিনি বলেছেন, সভায় তাকে দাওয়াত দেওয়া হয়েছিল। জিয়া হল সম্পর্কে ভিন্ন কথা বলার কারণে শ্রোতা উত্তেজিত হয়ে পড়েছিল। পরে তিনি অনুষ্ঠান স্থল ত্যাগ করতে বাধ্য হন।
এদিকে, সভায় বক্তারা বললেন, খুলনা শুধু একটি অঞ্চল নয়, এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রাণ কেন্দ্র। শিল্প নগরী থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক ও বর্ধিষ্ণু খুলনা গড়ে তোলার পেছনে খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ) সুদীর্ঘকাল ধরে কাজ করে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতেই বলেছিলেন, রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মালিকানা জনগণকে বুঝিয়ে দিবেন। আজ আমরা এখানে সমবেত হয়েছি কেবল কেডিএ’র ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনতে নয়, বরং এই খুলনাকে নিয়ে সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, প্রত্যাশা এবং ভাবনাগুলোকে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনায় যুক্ত করতে।
বক্তারা উল্লেখ করেন, ‘আগামীর খুলনা বিনির্মাণ’ বলতে আমরা এমন একটি আধুনিক বৃহত্তর খুলনার স্বপ্ন দেখি, যেখানে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকবে, থাকবে পরিকল্পিত আবাসন, যথাযথ নিষ্কাশন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সবুজ ও মনোরম পরিবেশ। আমাদের এই রূপসী খুলনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কীভাবে একটি স্মার্ট ও টেকসই গ্রিন-সিটি হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তা নিয়ে আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। কেডিএ ইতিমধ্যে খুলনার উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে; যার একটি সংক্ষিপ্ত ভিডিও চিত্র ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা উপস্থাপন করা হয়।
কেডিএ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট এসএম শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে সভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা-১ আসনের সংসদ সদস্য আমীর এজাজ খান। বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. রেজাউল করিম, খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. আব্দুল্লাহ্ হারুন, খুলনা রেঞ্জ ডিআইজি মো. মোস্তাফিজুর রহমান, খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদ হাসান।





