হুইলচেয়ারে ৩ কিমি পেরিয়ে যান স্কুলে
- দুই পা অচল প্রধান শিক্ষক কল্যাণ দেবের

সামনে কাদায় ডুবে থাকা রাস্তা। কোথাও জমে আছে পানি, কোথাও পিচ্ছিল পথ। এর পরেই একটি ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ। হুইলচেয়ারে বসে এসব পথ পাড়ি দিতে হবে তাকে। একজন সহকারীকে সঙ্গে নিয়ে প্রতিদিন এভাবেই প্রায় তিন কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে যান কল্যাণ কুমার দেব। দুই পা অচল হলেও পাঠদান থামেনি তার।
কল্যাণ কুমার দেব চুনারুঘাট উপজেলার মিরাশী ইউনিয়নের বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। ২০১৮ সালে ছাদ থেকে পড়ে গুরুতর আহত হওয়ার পর হারিয়ে যায় তার দুই পায়ের চলাচলের সক্ষমতা। দীর্ঘদিন সিআরপিতে চিকিৎসা নিয়েছেন। এরপর থেকে হুইলচেয়ারই তার চলাচলের একমাত্র মাধ্যম।
শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতা তাকে শিক্ষকতা থেকে দূরে সরাতে পারেনি। ১৯৯৯ সালে শিক্ষকতা পেশায় যোগ দেন কল্যাণ কুমার। ২০১৩ সালে বড়ব্দা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগ দেওয়ার পর ইংরেজি বিষয়ে দক্ষতার কারণে শিক্ষক প্রশিক্ষণের সঙ্গেও যুক্ত হন। সহকর্মীদের কাছে দক্ষ ও বিনয়ী শিক্ষক হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে।
বর্তমানে তিনি আহমেদাবাদ ইউনিয়নের রাজার বাজার এলাকায় নিজ বাড়িতে থাকেন। বাড়ি থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব প্রায় তিন কিলোমিটার। স্বাভাবিক সময়ে এই পথ পাড়ি দেওয়া কঠিন না হলেও বর্ষায় তা হয়ে ওঠে দুর্ভোগের। কাঁচা রাস্তা কাদা-পানিতে ডুবে যায়। কোথাও পিচ্ছিল পথ, কোথাও ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ। হুইলচেয়ার নিয়ে একা চলার সুযোগ নেই। তাই প্রতিদিন একজন সহকারীকে সঙ্গে নিতে হয়। এজন্য মাসে প্রায় ৬ হাজার টাকা ব্যয় হয় বলে জানা গেছে।
কল্যাণ কুমার বলেছেন, বর্ষায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে অনেক কষ্ট হয়। তবু শিক্ষার্থীদের কথা ভেবে দায়িত্ব পালনে তিনি পিছিয়ে যেতে চান না।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব নিয়মিত পালন করে যাচ্ছেন তিনি। কিন্তু প্রতিদিনের এই যাতায়াত তার জন্য শারীরিকভাবে যেমন কষ্টকর, তেমনি ব্যয়বহুলও।
স্থানীয় বাসিন্দা ও কয়েকজন শিক্ষক বলেছেন, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা বিবেচনায় কল্যাণ কুমারকে বাড়ির কাছাকাছি কোনো বিদ্যালয়ে বদলি করা হলে তার দুর্ভোগ অনেকটাই কমবে। সরকারি বিধি অনুযায়ী মানবিক বিবেচনায় এ বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানালেন তারা।
দুই পা তাকে আর বহন করে না। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ গড়ার দায়িত্ব থেকে সরে যাননি কল্যাণ কুমার। প্রতিদিন হুইলচেয়ারে চেপে তিন কিলোমিটারের সেই পথ পাড়ি দিয়ে তিনি যেন বলে চলেছেন— শরীরের সীমাবদ্ধতা দায়িত্ববোধকে থামিয়ে দিতে পারে না।



