কাজের সঙ্গে পেটেরও ছুটি
দিবস আসে দিবস যায়, বদলায় না বিড়ি শ্রমিকের ভাগ্য
- মে দিবসেও বদলায় না ঝালকাঠির বিড়ি শ্রমিকের ভাগ্য
- কাজ করে দৈনিক মেলে ৩০০-৪০০টাকা
- বিড়ি কারখানায় খেটে মজুরির নামে মেলে ব্যাধি
- বিড়ি কারখানায় শ্রমিকদের শেষ সঙ্গী রোগবালাই
- মাস শেষে আয় দাঁড়ায় ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা

ছবি: আগামীর সময়
শ্রমেই মেলে পারিশ্রমিক। এ তো সবার জন্যই। আজ মে দিবস। বন্ধ কাজের দুয়ার। কিন্তু সবার জন্য কি তাই? বন্ধ থাকবে কি রিকশাওয়ালার চাকা? পেটের দায়ে তাকে নামতে হয় রাস্তায়। ছুটি নেই। কারণ তিনি দিন আনেন দিন খান।
এমন অনেক কারখানা আজ বন্ধ। সেখানকার শ্রমিকদেরও ছুটি। কিন্তু পাবেন না মজুরি। তারা তো আর চাকরি করেন না। যে ছুটি হলেও মিলবে বেতন।
ধরা যাক ঝালকাঠির অমৃত লাল দে কারিকর বিড়ি কারখানা। সেখানে কাজ করেন আড়াইশ শ্রমিক। কারখানাটি আজ বন্ধ। শ্রমিকদেরও ছুটি। মিলবে না মজুরি। সিস্টেম হয়তো তাই বলে। কিন্তু আজ যে তারা মজুরি পাবেন না তাদের কথা-ব্যাথা কে বলবে? তারা যে কাজ করেন হাজিরা, ঘণ্টা মেনে।
কেমন এই বিড়ির কারখানা? জানা গেল, সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত চলে টানা কাজ। এখানে যারা কাজ করেন তাদের দৈনিক আয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। প্রতি হাজার বিড়ি তৈরির মজুরি ১০৪ টাকা নির্ধারিত। একজন শ্রমিক দিনে গড়ে ৩ থেকে ৪ হাজার বিড়ি তৈরি করলেও মাস শেষে আয় দাঁড়ায় ৬ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা।
বিড়ি কারখানায় কাজ করলে যে স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকে সেটা স্বীকার করেই শ্রম দিচ্ছেন শ্রমিকরা। নানা শঙ্কার কথা উল্লেখ করে শ্রমিক কামরুল ইসলাম জানালেন, ‘দীর্ঘ সময় তামাক নিয়ে কাজ করে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে শরীরে। অল্প বয়সে অসুস্থ হন অনেকেই। অন্য পেশার মানুষ যদি বাঁচে ৮০ বছর, আমরা বাঁচব ৬০ বছর’।
তার উদ্বেগের কারণ ব্যাখ্যা করলেন ঝালকাঠি সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. টি এম মেহেদী হাসান সানী। তিনি বললেন, ‘তামাকের সংস্পর্শে দীর্ঘসময় কাজ করলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শ্বাসযন্ত্র। এতে বাড়ে যক্ষ্মা, হাঁপানি ও ব্রংকাইটিসের ঝুঁকি।’
অসহায়ত্ব প্রকাশ করলেন নারী শ্রমিক ময়না বেগম। তার ভাষ্য, মজুরি কম হলেও ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন তারা। পরিবারের প্রয়োজনে উপায় নেই এই পেশা ছাড়ার।
‘অন্য কোনো কাজের সুযোগ না থাকায় এখানেই কাজ করছি’— উপযুক্ত কর্মসংস্থানের অভাবের কথা জানালেন আরেক শ্রমিক নাজমা বেগম।
বিড়ি কারখানায় খেটে রোগ-ব্যাধি ছাড়া কিছুই মেলেনি বলে আক্ষেপ প্রবীণ শ্রমিক মালার। ‘বছরের পর বছর কাজ করেও হয়নি ভবিষ্যতের জন্য কোনো সঞ্চয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে সক্ষমতা। কাজ বন্ধ হলে কী হবে, তা নিয়ে থাকি দুশ্চিন্তা।’
নীতিহীন শ্রম নিয়ে ক্ষুব্ধ অন্য শ্রমিক কবির ও করিম তালুকদার। কোম্পানির নেই কোনো পেনশন বা বীমা সুবিধা। কাজ শেষে মেলে না নিরাপত্তা। আমাদের চিকিৎসার জন্য চিকিৎসক থাকলেও তার সাক্ষাৎ পেতে পাড়ি দিতে হয় ‘সাত সমুদ্র তের নদী’। তিনি বরিশাল শহরে বসায় সেবা নিতে গেলে নষ্ট হয় পুরো একটি দিন, তাই কারও ভাগ্যে জোটে না প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা।
‘সপ্তাহে সীমিত কর্মদিবস ও কম মজুরির কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে শ্রমিকদের জীবন। ন্যায্য মজুরি কাঠামো, পূর্ণ কর্মদিবস, চিকিৎসা সুবিধা, বোনাস ও শ্রমিক কল্যাণ তহবিল গঠন জরুরি
কারখানার ম্যানেজার রতন কুমার দত্ত জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ লাখ বিড়ি উৎপাদন করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয় এবং শ্রমিকদের সুবিধার বিষয়টি দেখা হচ্ছে।
হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের ঝালকাঠি জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট আককাস সিকদার বলেছেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি শ্রমিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য। নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি।’
দেড়শ বছরেও মেলেনি শ্রমিক দিবসের সুফল।



