গ্যাস দুর্যোগে থমকে নরসিংদী

গ্যাসের জন্য নরসিংদীর একটি ফিলিং স্টেশনের সামনে গাড়ির দীর্ঘ সারি। ছবি : সংগৃহীত
শিল্পের শহর হিসেবে পরিচিত নরসিংদী এখন অনেকটাই নিঃশব্দ। সরবরাহ লাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় চার দিন ধরে মিল-কারখানার চাকা ঘুরছে না। টেক্সটাইল ও স্পিনিং মিলগুলোয় নেই চিরচেনা কোলাহল। অন্যদিকে বাসাবাড়িতে জ্বলছে না রান্নার চুলা। সিএনজি স্টেশনে গাড়ির দীর্ঘ সারি। তীব্র গ্যাসসংকট— সব মিলিয়ে থমকে দিয়েছে পুরো জেলার জনজীবন।
জেলার ঐতিহ্যবাহী চৌয়ালা শিল্প এলাকা। প্রতিদিন হাজারো শ্রমিকের হাঁক-ডাকে মুখর থাকে এই জনপদ। কিন্তু কয়েক দিনের দৃশ্যপট ভিন্ন। মেসার্স ফকির সাইজিং মিলের চত্বর এখন খাঁখাঁ করছে। নীরব হয়ে পড়ে আছে কোটি টাকার মেশিনপত্র। তদারকির জন্য একা ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন সুপারভাইজার আবুল মোমেন। চোখে তার গভীর দুশ্চিন্তা।
তিনি বলছিলেন, ‘চার দিন ধরে কোনো কাজ নেই। প্রতিদিন দেড় থেকে দুই লাখ টাকা লোকসান হচ্ছে। কাজ না থাকলেও শ্রমিকদের বসিয়ে বেতন দিতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কারখানা চিরতরে বন্ধ করা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
একই সুর পাকিজা স্পিনিং মিলের শ্রমিকদের কণ্ঠে। প্রতিদিনের কামাইয়ে যাদের সংসার চলে, তাদের ওপর নেমে এসেছে ঘোর অনিশ্চয়তা। কারখানা বন্ধ হলে পরিবার নিয়ে রাস্তায় বসতে হবে এই কর্মজীবীদের।
কারখানাটির জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাব আলী মুন আক্ষেপ করে বললেন, ‘গ্যাস হলো স্পিনিং মিলের হৃৎস্পন্দন। হৃৎস্পন্দন না থাকলে মেশিন চলবে কীভাবে? গত মঙ্গলবার রাত থেকে উৎপাদন তলানিতে। জেনারেটর চালানোর মতো গ্যাসও মিলছে না।’
সবচেয়ে করুণ দশা শ্রমিকদের। প্রতিদিনের ঘামে যাদের হাঁড়ি চড়ে, তাদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। পাকিজার শ্রমিকরা ক্ষোভ আর আতঙ্ক চেপে বলছিলেন, ‘কারখানা বন্ধ হলে তারা কোথায় যাবেন? দিন এনে দিন খান। কাজ না থাকলে পরিবার না খেয়ে মরবে।’
ভোগান্তির মাত্রা ছাড়িয়েছে গৃহস্থালিতেও। ভোরের আলো ফুটতেই চুলা থেকে গ্যাস উধাও। দুপুর গড়িয়ে রাত হলেও দেখা মিলছে না কাঙ্ক্ষিত নীল শিখার। রান্না বন্ধ থাকায় বিকল্প হিসেবে চড়া দামে কিনতে হচ্ছে কেরোসিন বা এলপিজি। অনেক পরিবার নির্ভর করছে দোকান বা হোটেলের খাবারের ওপর।
সড়কের চিত্রও বেশ করুণ। ভোর হতেই সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোয় শুরু হচ্ছে কিলোমিটার জুড়ে গাড়ির লাইন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত চাপে গ্যাস। ফলে যান চলাচল কমে যাত্রী ভোগান্তি পৌঁছেছে চরমে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) বড় ধসের শঙ্কা প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির মতে, জাতীয় অর্থনীতিতে নরসিংদীর টেক্সটাইল খাতের অবদান অপরিসীম। দ্রুত এ সংকট কাটানো না গেলে একের পর এক কারখানা বন্ধ হয়ে যাবে চিরতরে।
কেন এই ভয়াবহ সংকট? তিতাস গ্যাসের নরসিংদীর আঞ্চলিক বিপণন কার্যালয়ের ম্যানেজার মাকসুদ রহমান জানালেন সংকটের পেছনের কারণ। তিনি বললেন, ‘এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিয়েছে। ফলে নরসিংদীসহ আশপাশের জেলাগুলোয় গ্যাসের চাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। এলএনজি টার্মিনাল মেরামতের কাজ চলছে। দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে।’
যদিও কর্মকর্তাদের আশ্বাসে মন ভরছে না দুশ্চিন্তাগ্রস্ত কারখানা মালিক ও সাধারণ মানুষের। লোকসানের খাতা দিন দিন ভারী হচ্ছে। সংকট কাটাতে কার্যকর ও স্থায়ী সমাধানের দিকেই তাকিয়ে আছেন নরসিংদীর সর্বস্তরের মানুষ।




