পাইকগাছার ‘ভাসমান হাসপাতাল’

ছবি: আগামীর সময়
চারপাশে থমথমে সুন্দরবনের সবুজ বেষ্টনী, আর মাঝখানে প্রমত্তা শিবসা নদীর বুক চিরে ভেসে বেড়াচ্ছে একখণ্ড আস্থার ঠিকানা— ‘ভাসমান হাসপাতাল’। চিকিৎসাবঞ্চিত উপকূলের অবহেলিত মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে খুলনার পাইকগাছায় শুরু হয়েছে এক সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমী ও যুগান্তকারী এ কার্যক্রম। নদীবেষ্টিত দুর্গম জনপদের মানুষের কাছে এ দৃশ্য যেন রূপকথাকেও হার মানায়, কারণ এমন উদ্যোগ এ অঞ্চলে এই প্রথম।
সৌদি আরবের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের এ জনকল্যাণমূলক উদ্যোগের ফলে অবহেলিত গড়ইখালী ও আশপাশের অঞ্চলের দুস্থ মানুষের দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যবঞ্চনার অবসান হতে চলেছে।
আজ সোমবার দুপুরে শিবসা নদীর তীরে ফিতা কেটে এই ভাসমান হাসপাতালের চিকিৎসা কার্যক্রমের উদ্বোধন করেন খুলনা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ।
দুর্গম জনপদে অন্যরকম প্রাপ্তি
খুলনার পাইকগাছার গড়ইখালী ইউনিয়নটি সুন্দরবনের কোলঘেঁষা এবং নদীবেষ্টিত হওয়ায় এখানকার যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত। সামান্য চিকিৎসার জন্যও এ অঞ্চলের মানুষকে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘপথ, যা গরিব ও দুস্থ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব। আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে আজীবন বঞ্চিত এ অঞ্চলের মানুষের কষ্ট দূর করতেই শিবসা নদীতে নোঙর গেড়েছে এই বিশেষ হাসপাতালটি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের অ্যাডমিন শাহ আলম, প্রজেক্ট ম্যানেজার ফিরোজ আক্তার, খুলনা জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আমিনুল ইসলাম এবং পাইকগাছা উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির মাওলানা জিএম বুলবুল আহমেদসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
টানা তিন মাস মিলবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভাসমান হাসপাতালটি আগামী তিন মাস একটানা শিবসা নদীতে অবস্থান করবে। এর মাধ্যমে গড়াইখালী এবং আশপাশের উপকূলীয় এলাকার হাজার হাজার অসহায়, দুস্থ ও চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষ ঘরে বসেই বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে জরুরি চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করতে পারবেন।
স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম দাবি করেন, আমাদের এলাকায় অনেক দরিদ্র মানুষ রয়েছেন যাদের পক্ষে দূরে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়া কঠিন। নদীতে ভাসমান হাসপাতাল চালু হওয়ায় তারা কাছাকাছি থেকে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন। এটি আমাদের এলাকার মানুষের জন্য খুবই উপকারী উদ্যোগ।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা রাজ্জাক শেখ বলেছেন, উপকূলীয় এলাকায় চিকিৎসকের কাছে যাওয়া অনেক সময় কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের মানুষ চিকিৎসার খরচ জোগাতে হিমশিম খান। ভাসমান হাসপাতালটি তিন মাস সেবা দিলে এলাকার অনেক অসহায় মানুষ উপকৃত হবেন বলে আশা করছি।
উদ্বোধনকালে প্রধান অতিথি সংসদ সদস্য আলহাজ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ জানান, উপকূলীয় এলাকার চিকিৎসাবঞ্চিত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে এ ভাসমান হাসপাতালটি একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও নানা সীমাবদ্ধতার কারণে যেসব মানুষ কখনো ভালো ডাক্তারের মুখ দেখেননি, তারা এখন নদীর বুকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন। এ ব্যতিক্রমী উদ্যোগ উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রায় এক নতুন মাত্রা যোগ করবে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবায় এ ‘ভাসমান হাসপাতাল’ শুধু একটি চিকিৎসাকেন্দ্রই নয়, বরং এটি উপকূলবাসীর মনে বেঁচে থাকার নতুন এক স্বপ্ন ও আস্থার প্রতীক হয়ে উঠেছে।




