জামায়াত নেতার খেয়াঘাট দখলে নিলেন বিএনপি নেতা

ফাইল ছবি
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে জামায়াত নেতার ইজারা নেওয়া খেয়াঘাট দখলের অভিযোগ উঠেছে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন জামায়াত নেতা।
জানা গেছে, কাপাসিয়া ইউনিয়নের তিস্তা নদীর ভাটিকাপাসিয়া খেয়াঘাটটি ইজারা নিয়েছিলেন ইউনিয়ন জামায়াতের আমির মো. হারুন-অর-রশিদ। সম্প্রতি ওই ঘাটটি জোরপূর্বক দখলে নিয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক জামাল উদ্দিন।
সুন্দরগঞ্জ থানার ওসি শাহিন মোহাম্মদ আমানুল্লাহ জানিয়েছেন, খেয়াঘাট দখলের বিষয়ে একটা লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। ঘটনার তদন্ত করছে পুলিশ। প্রতিবেদন পাওয়ার পর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে জামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে লাঠি, ছোরা ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত একদল লোক ঘাটে প্রবেশ করে। এ সময় ইজারাদারের নৌকায় কর্মরত মাঝি মো. কবির উদ্দিনকে নৌকা থেকে টেনে নামিয়ে মারধর করেন তারা। এরপর সেখানে থাকা যাত্রীদের সরিয়ে দিয়ে দখলে নেন খেয়াঘাটটি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, লোহার রড দিয়ে কবির উদ্দিনের ডান পায়ে এলোপাতাড়ি পিটিয়ে তার হাড় ভেঙে দেন বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন। পরে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয় তাকে।
এতে উল্লেখ করা হয়েছে, হামলার পরও ঘাট না ছেড়ে উল্টো পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছেন অভিযুক্তরা। চাঁদা না দেওয়ায় এখন পর্যন্ত ঘাট নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন তারা। একই সঙ্গে ইজারাদার ও তার লোকজনকে হত্যা করে লাশ গুমের হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
জেলা পরিষদ সূত্র জানিয়েছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার রজবখালী লটঘাট, মাটিয়াল ফেরিঘাট, চন্ডিপুর, লালচামার ফারী, কাপাসিয়া-ভাটিকাপাসিয়া, উজান বুড়াইল, ভাটি বুড়াইল ও পোড়ারচর ঘাট নিয়ে গঠিত প্যাকেজ নম্বর-০৩-এর আওতায় খেয়াঘাটগুলো ইজারা দেওয়া হয়েছে। নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা হিসেবে ঘাটের ইজারা পান লালচামার গ্রামের রিয়াজুল হকের ছেলে মো. হারুন-অর-রশিদ। জেলা পরিষদের সঙ্গে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘাট পরিচালনার অনুমতি দেওয়া হয় তাকে। সেই থেকে খেয়াঘাটটি পরিচালনা করছেন জামায়াতের এই নেতা।
খেয়াঘাট পরিচালনায় সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ১৪৩১ বঙ্গাব্দে খেয়াঘাটে যাত্রীপ্রতি টোল আদায় করা হতো ৪০ টাকা। পরবর্তী মেয়াদে খাস কালেকশনের সময় স্থানীয়দের সম্মতিতে তা কমিয়ে নির্ধারণ করা হয় ৩০ টাকা। ওই সময়ের কালেকশন কার্যক্রমে অংশীদার ছিলেন বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিন। সেই ধারাবাহিকতায় চলতি মেয়াদেও ৩০ টাকা হারে টোল আদায় করা হচ্ছিল।
তবে অতিরিক্ত টোল আদায়ের অভিযোগ তুলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এবং ঘাট এলাকায় মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেছেন জামাল উদ্দিন। সেখানে অতিরিক্ত টোল আদায় বন্ধের দাবি জানিয়েছেন তিনি। এর পর থেকে বিরোধ শুরু হয় জামায়াত ও বিএনপির এই দুই নেতার মধ্যে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয়রা।
তবে ঘাট দখলের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাপাসিয়া ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক মো. জামাল উদ্দিন। তিনি বলেছেন, ‘কাউকে মারধর কিংবা চাঁদা দাবি করা হয়নি। তবে স্থানীয়দের দাবির মুখে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছি খেয়াঘাটটি। এর পর থেকে ৩০ টাকার পরিবর্তে ১০ টাকা করে টোল আদায় করা হচ্ছে।’
ইজারাদার মো. হারুন-অর-রশিদ বলেছেন, ‘বৈধ প্রক্রিয়ায় জেলা পরিষদ থেকে ঘাট ইজারা নিয়েছি। ১৪৩২ বঙ্গাব্দে খাস কালেকশনের সময় সবার সম্মতিতে ৩০ টাকা টোল নির্ধারণ করা হয়েছিল। তখন জামাল উদ্দিন নিজেও সেই কার্যক্রমে ছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও ৩০ টাকা টোল আদায় করা হচ্ছিল। অথচ এখন জোরপূর্বক ঘাট দখল করে আমার মাঝিকে পঙ্গু করে দেওয়া হয়েছে। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই।’
এ বিষয়ে উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. বাবুল আহমেদ বলেছেন, ‘হাট-বাজার ও খেয়াঘাট সরকারি সম্পত্তি। সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ইজারা প্রদান করে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর জোরপূর্বক দখল নেওয়ার এখতিয়ার নেই।’
তিনি আরও বলেছেন, ‘বিএনপি নেতা জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে খেয়াঘাট দখলের যে অভিযোগ উঠেছে, এর সত্যতা পাওয়া গেলে দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে তার বিরুদ্ধে।’
গাইবান্ধা জেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) বিপুল চন্দ্র দাস বলেছেন, ‘জেলা পরিষদ মালিকানাধীন সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ৩ নম্বর প্যাকেজভুক্ত খেয়াঘাটগুলো বৈধ প্রক্রিয়ায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। এই প্যাকেজের ঘাটগুলো সর্বোচ্চ দরদাতা হারুন অর রশিদ ইজারা পেয়েছেন। তাই ওই ঘাট অন্য কেউ দখল করার কোনো সুযোগ নেই।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ১০ টাকায় পারাপার কেন, ইজারাদার ছাড়া অন্য যে কেউ ফ্রিতেও পারাপার করাতে চাইলে সেটিও নিয়মবহির্ভূত। জেলা পরিষদের অনুমতি ছাড়া কোনো ব্যক্তি খেয়াঘাট পরিচালনা করতে পারেন না।






